• বুধবার, ১৭ অগাস্ট ২০২২, ০৮:১২ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
বিএমএসএফ কক্সবাজার জেলা শাখার উদ্দ্যোগে ১৫-ই আগষ্ট উপলক্ষে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল সম্পন্ন। নারী চিকিৎসককে গলা কেটে হত্যা, কথিত প্রেমিক কক্সবাজারের রেজা চট্টগ্রামে আটক ভোটার প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গা অধ্যুষিত সীমান্ত এলাকার জন্য ইসি সচিবালয় কর্তৃক ঘোষিত নির্দেশিকা। কক্সবাজার জেলার শ্রেষ্ঠ অফিসার ইন চার্জ মনোনীত হয়েছেন’ উখিয়া থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী নাদিম আবাসিক হোটেলে মিলল এক নারী চিকিৎসকের গলাকাটা লাশ, কথিত স্বামী পলাতক। বনের জন্য কক্সবাজার হবে মডেল জেলা-প্রধান বনসংরক্ষক কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিতে হেড মাঝিসহ ০২জন নিহত। আর্থিক খাতে লুটপাটের দায় জনগণ শোধ করবে কেন? মাদক ও ইয়াবার বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত রেখে তরুণ সমাজকে রক্ষা করুণ । কক্সবাজার জেলা বিএমএসএফ এর জরুরী সভা অনুষ্ঠিত

সেন্টমার্টিন’ ভ্রমণে উখিয়া সরকারি উচ্চবিদ্যালয় এস এস সি ব্যাচ-১৯৯২ ও লেখকের মনের মধুর অনুভূতি!

AnonymousFox_bwo / ২৭৬ মিনিট
আপডেট বৃহস্পতিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

এম আর আয়াজ রবি।

বাংলাদেশ একটি ব-দ্বীপ। এ দেশে লুকিয়ে আছে হাজারো অপরূপ সৌন্দর্য্যের তীর্থভুমি। চিরাচরিত এই অনিন্দ্য সুন্দন প্রাকৃতিক অপরুপ, আমরা খুব অল্পই অনুধাবন করতে পারি। প্রকৃতির এ অপরুপ সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে আমরা ছুটে যাই দেশ হতে দেশান্তরে। কিন্তু আমাদের নিজেদেরই রয়েছে অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি। রয়েছে হাজারো পর্যটন যায়গা, আছে হাজারো ইতিহাস মিশ্রিত সৌন্দর্য।

সেই রকম একটি মনোরম ও নয়ানাভিরাম সৌন্দর্য্যের তীর্থভুমি, যেখানে আকাশের ‘নীলিমা’ আর সমুদ্রের মনোমুগ্ধকর ‘নীল’ মিলেমিশে এক অনবদ্য কবিতা রচনা করে। যেখানে তীরে বাঁধা নৌকা, নান্দনিক নারিকেল বৃক্ষের সারি আর ঢেউয়ের ছন্দে মৃদু পবনের কোমল স্পর্শ।বালি, পাথর, প্রবাল কিংবা জীব বৈচিত্র্যের সমন্বয়ে জ্ঞান আর ভ্রমণ পিপাসু মানুষের জন্য অনুপম অবকাশকেন্দ্র , স্বচ্ছ পানিতে জেলি ফিশ, হরেক রকমের সামুদ্রিক মাছ, কচ্ছপ, প্রবাল বিশ্বরহস্যের জীবন্ত পাঠশালায় পরিণত করেছে যে স্থানটি, যেটিকে বলা হয় বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ যার অবস্থান কক্সবাজার জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা টেকনাফের তথা বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিনের একমাত্র ভুমি যেটা প্রায় ১০ হাজার অধিবাসীদের নিয়ে গঠিত একটি ইউনিয়ন যার নাম “সেন্ট মার্টিন দ্বীপ” বা Saint Martin’s Island। বালুকাময় সৈকত, প্রবালের প্রাচীর আর কেয়া গাছের সারি এই দ্বীপকে দিয়েছে আলাদা এক বৈশিষ্ট যা আর কোথাও তেমন চোখে পড়েনা।

কক্সবাজার জেলা শহর থেকে ১২০কিলোমিটার দূরে, টেকনাফ উপশহর থেকে প্রায় ৩৫ কিমি দূরে সাগর বক্ষের একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ সেন্টমার্টিন। চারদিকে শুধুপানি আর পানি। আয়তন ৮ থকে ১০ বর্গ কিলোমিটার। টেকনাফ থেকে ট্রলারে লঞ্চে কিংবা জাহাজে যেতে লাগে আড়াই থেকে সোয়া তিন ঘণ্টা। অধুনা বানিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম ও সৈকত নগরী কক্সবাজার থেকেও বড় জাহাজে করে সরাসরি সেন্টমার্টিন যাওয়া যায়। আমরা উখিয়া সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি-১৯৯২ ব্যাচের বন্ধুরা মিলে গত ১২ ফেব্রুয়ারী-২০২১ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারী-২০২১ মোট তিনদিন ‘উখিয়া টু কক্সবাজার ভায়া সেন্টমার্টিন’ প্রমোদ ভ্রমণ, নৌবিহার ও পুনর্মিলনী অনুষ্টান সম্পন্ন করেছি। যাত্রায় আমরা প্রায় ২৫ জনের বহর ছিলাম। মাত্র একঘন্টার পরিকল্পনায়, এক সপ্তাহের মধ্যে এত বড় এডভেঞ্চার সম্পন্ন করা আসলেই প্রানপ্রিয় বন্ধুদের ঐকান্তিক ইচ্ছা, প্রচেষ্টা, সক্রিয় ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহন, প্রমোদভ্রমণ উপকমিটির সকল সদস্যগনের নির্ঘুম কর্মব্যস্ততা, প্রচেষ্টা ও নিরলস সাধনার ফসল ছাড়া আর কিছু নয়। গত ৫-ফেব্রুয়ারী-২০২১ তারিখে, সন্ধ্যায়, উখিয়ায় সদ্য প্রতিষ্টিত চায়নীজ রেস্তোরেন্ট এ এক অনাড়ম্বর অনুষ্টানের মাধ্যমে আমরা আট দশেক বন্ধুর মিলন মেলায় আমাদের যাত্রার দিনক্ষন ঠিক করা হয়। উক্ত প্রমোদ ভ্রমণ প্রস্তুতি সভায় আমাদের প্রানের বন্ধু ৪ নং রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের বারবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও উখিয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সম্মানীত সাধারণ সম্পাদক জননেতা জাহাংগীর কবির চৌধুরী সাহেবের উপস্থিতি প্রমোদ ভ্রমণ প্রস্তুতিকে আরোও বেগবান করেছে। একই বৈঠকে সেন্টমার্টিন ভ্রমণকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক এম আর আয়াজ রবিকে প্রধান করে ৫ সদস্যের আহবায়ক কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন মাষ্টার নাসির,সাংবাদিক কাজী বাচ্চু, এডভোকেট রেজা ও মাষ্টার হাকিম বাবুল। উদ্দেশ্য, ৫ আহবায়ককে উখিয়ার ৫ ইউনিয়নের দায়িত্ব অর্পণ করে সাড়াসি অভিযান পরিচালনা করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বন্ধুদের উক্ত মহতি উদ্দোগে সম্পৃক্ত করা। যেমনি উদ্যোগ তেমনি কাজ। প্রমোদ ভ্রমনের তারিখ ধার্য্য করা হয় ১২-ফেব্রুয়ারী-২০২১ এবং সেন্টমার্টিন থেকে ফিরে আসার তারিখ নির্ধারন করা হয় ১৪-ফেব্রুয়ারী-২০২১। পথিমধ্যে আমরা এসএসসি-১৯৯২ ব্যাচ একদিন কক্সবাজার অবস্থান করব।

যেহেতু খুব সকালে কক্সবাজার বিআইডাব্লিউটিএ ঘাট থেকে সকাল সাড়ে সাতটায় কর্ণফুলী এক্সপ্রেস জাহাজটি সেন্টমার্টিনের উদ্দ্যেশ্য রওয়ানা হয়, তাই বন্ধু রেজার বদান্যতায় প্রায় সকল বন্ধু তার পরিচালিত আলবেট্রস রিসোর্টে একদিন অবস্থান করার সুযোগও প্রাপ্ত হয়। বন্ধুরা সবাই ১২-ফেব্রুয়ারী-২০২১ তারিখে কক্সবাজারের উদ্দ্যেশ্যে রওয়ানা হয়। আমরা সবাই এলবেট্রস রিসোর্টে অবস্থান করি এবং প্রত্যেকের ব্যাগ, লাগেজ হোটেল রুমে রেখে কক্সবাজারের অলিগলি বিচরণ করে, বিকেলে লাবনী পয়েন্ট ও সুগন্ধা পয়েন্টে সমুদ্রের গর্জন ও হাজার হাজার দর্শনার্থীদের কোলাহলে মুখরিত সীবিচে অনেক্ষন সময় পার করে আবার রিসোর্টে ফিরে এসে ফ্রেস হয়ে রাতের খাবার খেয়ে রিসোর্ট রুমে বন্ধুদের আড্ডায় ব্যস্ত হয়ে কত ধরনের স্মৃতিচারন করি ও দুষ্টুমীর ঢালী সাজাই সেটা বলাই বাহুল্য। সারারাত আমরা বন্ধুদের আড্ডায় মশগুল ছিলাম। শেষ রাতে একটু চোখ ভারী হয়ে আসতে বন্ধু খোকনের ফোনে আড়মোড়া ভেংগে ফোন রিসিভ করাতে খোকন বলল, আহবায়ক সাহেব তুই বিচার করবি। আমি ঘুমাতে পারচিনা রুমে অবস্থানরত অন্য বন্ধুদের নাকের আওয়াজের কারনে। খোকন আরো বলে,একটু ঘুম আসতেই কোন (বে) রসিক বন্ধু আংগুল দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অর্গানে আঘাত করছে! আহবায়ক সাহেব তোকে বিচার করতেই হবে। আমি উক্ত দুষ্টুমীর কথা আমার রুমের অন্য বন্ধুদের ডেকে বলতেই সবাই আড়মোড়া ভেংগে হাসিতে লুটিয়ে পড়তে লাগল! এভাবে দুষ্টুমী করতে করতে কখন ফজরের আজান দিয়ে দিল টের ও পাইনি। ফ্রেশ হয়ে শেষে ফজরের নামাজ পড়ে, অন্যান্য বন্ধুদের জাগিয়ে দিয়ে সবাইকে নিয়ে জাহাজ ঘাটের দিকে রওয়ানা দিলাম। আমরা সকাল সাড়ে ছয়টায় জাহাজ ঘাটে পৌঁছে গেলাম। সেখানে গিয়ে শুনি জোয়ার ভাটার কারনে জাহাজ ছাড়তে দেরি হবে। প্রায় সাড়ে আটটা বাজবে। ইত্যিবসরে আমরা সবাই জাহাজ ঘাটের পাশের রেস্তোরেন্টে সকালের নাস্তা শেষ করে সাড়ে আটটার দিকে জাহাজের উদ্দ্যেশ্যে রওয়ানা দিলাম। আমরা অনেকেই এতবড় জাহাজে প্রথম আরোহন করেছি।

প্রায় পাঁচতলা জাহাজে আরোহন করে শত শত মানুষকে একই ছাদের নিচে দেখে খুবই পুলক অনুভব করলাম। অনেক দিন পরে অনেক বন্ধুদের একসাথে পেয়ে সকলের মুখের ভাষা সেই আশির দশকের গ্রামের অবুঝ গ্রাম্য বালকের ভাষা হয়ে ব্যবহ্রত হতে লাগল! সকলের মুখে ভালবাসার গালি ও বুলি! যেসব ভাষায় একজন অপর জনের সাথে যোগাযোগ করেছে তা এখানে লেখাই বাহুল্য! লেখক আপনারা বুঝে নিন আমাদের বন্ধুদের মুখের ভাষার শ্রী! আমি নিজে ত্রিশ বছর চট্টগ্রাম শহরে অবস্থান করে বন্ধুদের সাথে পাল্লা দিয়ে মুখের বুলির যে পরিবর্তন ঘটেছিল-এরুপ একসপ্তাহ থাকলে আমার ভাষা শিক্ষার ইনষ্টিটিউটে ভর্তি হতে হতো বৈকি! আমি মনে করি বন্ধুদের এরুপ ভাষার ব্যবহার, সম্বোধন বন্ধুত্বের বন্ধনকে আরও বেশি পাকাপোক্ত করেছে। একএকজনের এক এক ধরনের জীবনের গল্প, পারিপার্শ্বিকতার গল্প, স্কুল জীবন, কলেজ জীবন, ভার্সিটি জীবনের গল্প বন্ধুদেরকে মারাত্মক হাসির খোরাক জোগিয়েছে। আমার শরীরটা একটু অসুস্থ ছিল কিন্তু বন্ধুদের হাসির গল্পের বাণে আমার অসুস্থতাও যেন কোথায় উবে গিয়েছিল। আমরা হাসতে হাসতে একাকার হয়ে পড়েছিলাম। সাড়ে দশটার দিকে আমাদেরকে জাহাজ কর্তৃপক্ষ হালকা নাস্তার ব্যবস্থা করল। আমরা সবাই নিজস্ব সিট ছেড়ে জাহাজের চার তলায় গিয়ে অবস্থান করি। আস্তে আস্তে বন্ধুরা সুর বেসুরে গান ধরে। গান করে নৃত্য প্রদর্শন করে জাহাজের শত প্যাসেঞ্জারদের মজা দিচ্ছিল। বাচ্চু, আশিষ, দিশু, বাবুল, মাকসুদ, রবি, জাহাংগীর, রেজা, আয়াজ, মিন্টু, কায়সার, জামাল প্রমুখ বন্ধুরা নেচে,গেয়ে, আনন্দ, উল্লাসে জাহাজকে বিমোহিত করে তুলেছিল। একদিকে দীর্ঘ যাত্রার জার্নি, প্রত্যেকের বোরডোম কেটে তোলার জন্য বিশাল বংগোপসাগরের অনাবিল সৌন্দর্য্য অবলোকন করতে করতে এবং অন্যদিকে সুরে বেসুরে গান নাচ করতে করতে যাত্রা ঠিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল।

এর পরে দেখি আমরা যেখানে সবাই মিলে দুষ্টুমি করছি সেখানেই জাহাজের নির্ধারিত মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট রয়েছে। জাহাজ ঘন্টা তিনেক যাত্রার পরে জাহাজের নির্ধারিত মিউজিকম্যানরা চলে এসেছেন। বন্ধু এডভোকেট রবীন্দ্র মাইক্রোফোন হাতে একের পর এক মজা করছিল এবং বন্ধুদেরকে দিয়ে গান করাচ্ছিল। বন্ধুরা অনেক সুন্দর সুন্দর গান করছিল এবং সবাই প্রানভরে উপভোগ করছিল। বেরসিক রবি মাইক্রোফোনে যখনই গান পরিবেশনের জন্য আমার নাম ঘোষনা করল, তখনই আমার হার্টবিট বেড়ে গেল! আমি তো গায়ক নয় কিন্তু বার্থরুম সিংগার। মাইক্রোফোনে যখনই সুর তুলতে গিয়ে ‘ময়ুর কন্ঠী রাতেরই ভীড়ে আকাশের তারাদের ঐ মিছিলে’ গানটি করতে যাচ্ছিলাম কোনভাবেই পরের লাইন মুখ থেকে আসছিল না। বন্ধুরা পরের লাইন বলে দিয়ে দিয়ে গান করানোর শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ চেষ্টা করেছি মাত্র। বন্ধু হাকিম, আশিষ, মাকসুদ, বাচ্চু খুব ভাল, সুন্দর গান করেছে যা জাহাজ প্রাংগন মাতিয়ে তুলেছে। ইত্যিবসরে জাহাজের যাত্রী সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিবর্গ প্রোগ্রামে জয়েন করতে লাগলেন। স্বপ্রনোদিত হয়ে অনেক শিল্পী গান করতে লাগলেন। অতিথি শিল্পী হ্যাপী ম্যাডাম গান শুরু করতেই পরিবেশ আরোও অনুকুলে চলে আসল। একের পর এক তিনি মনোমুগ্ধকর গান করাতে আমাদের বন্ধু চেয়ারম্যান জাহাংগীর ম্যাডামের গানে সন্তুষ্ট হয়ে কচকচে টাকার নোট পুরস্কৃত করল এবং আরও বেশি মজা নিতে লাগল। এরুপ করতে করতে সমুদ্রের বিশাল জলরাশি ডিংগীয়ে আমরা আমাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলের কাছাকাছি চলে আসি। জাহাজ তীরের কাছাকাছি ঘেঁষতে পারলনা, ভাটা অবস্থা চলমান থাকায়। তাই আমরা একে একে সবাই ডিঙ্গী নৌকায় করে জাহাজ থেকে কুলে উঠলাম। কুলে উঠে সোজা আমাদের নির্ধারিত রয়েল বীচ রিসোর্টে চলে আসলাম। ব্যাগ ও প্রত্যেকের লাগেজ হোটেলে রেখে পুর্ব থেকে আমাদের সেন্টমার্টিনের উখিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি ৯২ ব্যাচের বন্ধু মাহবুব কর্তৃক নির্ধারিত লাঞ্চ শেষ করার জন্য সবাই রওয়ানা করলাম। প্রায় পাচটার দিকে আমাদের লাঞ্চ শেষ করে আছরের নামাজ শেষ করে আবার বন্ধুদের নিয়ে সমুদ্রের তটদেশে ফুটবল খেলতে গেলাম। যেহেতু আমি কোমরে আঘাত প্রাপ্ত ছিলাম, তাই গোল কী হিসেবে দাঁড়িয়েছিলাম। এক পক্ষ চেয়ারম্যান দল, অন্য পক্ষ এডভোকেট রেজা দল। আমি কিন্তু চেয়ারম্যান দলের গোল কী ছিলাম। কিন্তু আমার প্রতিপক্ষ বন্ধু ভূট্রো সুনিপুনভাবে আমার পাশ দিয়ে বল গোল পোষ্টে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিল যা আমি টেরও পাইনি!! পরের বার বন্ধু মাকসুদ গোল পোষ্টে বল টেলে দিতে গিয়ে আমার নির্দিষ্ট লজ্জাস্থানে সজোরে মেরে আমাকে মাটিতে ফেলে দিয়েছিল। একদিকে কোমরে ব্যথা অন্যদিকে আমার লজ্জাস্থানে বল পড়ে আমার অবস্থা কেরোসিন করে ফেলেছিল। আল্লাহর অশেষ রহমতে আঘাত গুরুতর না হওয়ায় এ যাত্রায় আমি বেঁচে যাই। মহান আল্লাহকে ধন্যবাদ।

আমাদের হোটেলটি সমুদ্রের তটদেশে অবস্থান করায় আমরা আমাদের রিসোর্ট থেকেই সমুদ্রের হাজার হাজার তরংগমালা ও ঢেউ উপভোগ করছিলাম। সমুদ্রের সোঁ সোঁ উষ্ণ-শীতল বাতাসে প্রত্যেকের মনে অন্য অনুভুতি দোলা দিতে লাগল। খোলা-মেলা বালুকাময় সমুদ্র সৈকত আর সমুদ্রের বিরামহীন গর্জন যেন নীল রঙের রাজ্যে পরিণত করেছে সেন্টমার্টিনকে। প্রকৃতি দুই হাত মেলে যেন সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে এখানে। ‘দক্ষিণের স্বর্গ’ নামে পরিচিত এই দ্বীপে সারি সারি নারিকেল গাছ, ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে চলা গাঙচিল। সৈকতে বসে স্নিগ্ধ বাতাসে গা জুড়িয়ে নেওয়া, কেয়া বন আর সাগরলতার মায়াময় স্নিগ্ধতায় মন জুড়িয়ে যায় নিমিষেই। বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল ধ্রুবতারা নন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ অবকাশ যাপনের জন্য পছন্দের শীর্ষে রেখেছিলেন অনিন্দ্য সুন্দর এই দ্বীপকে। দেশের ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে পরম আরাধ্য একটি পর্যটন গন্তব্য হচ্ছে সেন্টমার্টিন দ্বীপ। সেন্টমার্টিনের প্রতিবেশ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হলো প্রবাল। সাগরের ছোট-বড়, মেরুদণ্ডী-অমেরুদণ্ডূ অধিকাংশ প্রাণী ও উদ্ভিদকে আগলে রাখে এসব প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ। ভাটায় জেগে ওঠা নান্দনিক প্রবাল প্রাচীর, উড়ে চলা গাঙচিল, পশ্চিম বিচ থেকে দেখা সূর্যাস্তের অপরূপ সৌন্দর্য, স্নিগ্ধ বাতাস আর অগভীর সাগরের স্বচ্ছ নীল জলে দল বেঁধে বাধ ভাঙা উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠার লোভে প্রতিবছর পর্যটন মৌসুমে লাখ লাখ পর্যটক পদচিহ্ন আঁকেন এ দ্বীপে।

রাতে বসে বন্ধুদের এক জম্পেস মিলনমেলা। হোটেলের রেস্তোরেন্টেই বসে বার-বি-কিউ-যেখানে বসে ১৭ কেজি ওজনের এক সামুদ্রিক কোরাল ও রূপচাঁদা মাছের বার-বি-কিউ এর মজা! বন্ধু চেয়ারম্যান জাহাংগীর ও মাহবুব বাজার থেকে বিশাল আকৃতির এক মাছ নিয়ে এসেছে যেটা দেখে প্রথমে তিমি মাছের আস্ত এক বাচ্চা বলে ভ্রম হচ্ছিল ! বন্ধুদের নিয়ে বসে এক মিলন মেলা ও সেন্টমার্টিন ভ্রমনের অনুভূতি প্রকাশ এবং সকল বন্ধুদের সম্মাননা স্মারক মগ উপহার। সকল বন্ধু এই বিশাল আয়োজনের জন্য সকল বন্ধুদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। বিশেষ করে প্রমোদ ভ্রমণ উপকমিটির সকল সদস্য ও বন্ধুবর চেয়ারম্যান সাহেবকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন সকলেই। স্মারক প্রদান অনুষ্টানের পরেই আমরা সবাই মিলে মাছের বার-বি-কিউ অত্যন্ত আনন্দ ঘন পরিবেশে উপভোগ করলাম। মাছটা বেশি গরম দিতে গিয়ে পুড়ে যাওয়ায় কিছু অংশ খাওয়ার অনুপযোগী হওয়ায় বন্ধু ওমর খান একটু উস্মা প্রকাশ করেছে মাত্র! সারাদিনের ক্লান্তিতে বন্ধুরা খুবই টায়ার্ড থাকায় প্রায় এগারটার দিকে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিল।

সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে ছেঁড়া দ্বীপের দিকে যাত্রা করার জন্য প্রস্তুতি নিল সবাই মিলে। সেন্টমার্টিনে ছেঁড়া দ্বীপ অন্য আরেকটা দেখার প্রাকৃতিক নিদর্শন। সকালের নাস্তা শেষ করে আমরা সব বন্ধুরা একটা ইঞ্জিনের নৌকায় উঠে সবাই লাইফ জ্যাকেট পরিধান করে অচিন ভুমি ছেঁড়া দ্বীপের দিকে রওয়ানা করলাম। প্রায় হাফ ঘন্টা ইঞ্জিনের নৌকায় চড়ে আমরা ছেঁড়া দ্বীপে পৌছলাম। ছেঁড়া দ্বীপ মানে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ অর্থাৎ সেন্টমার্টিন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি দ্বীপ উঠেছে যা জোয়ারের সময় ডুবে থাকে ও ভাটার সময় দৃশ্যমান হয়। এই ছেঁড়া দ্বীপ ২০০০ সালে সেন্টমার্টিনের অদুরে প্রথম দৃশ্যমান হয়। সেখান থেকে এখন হাজার হাজার দর্শনার্থীর মনের খোরাক হয়ে রয়েছে এই ছেঁড়া দ্বীপ। মূল দ্বীপের সঙ্গে ছেঁড়া দ্বীপের সংযোগস্থল (স্থানীয়ভাবে গলাচিপা নামে পরিচিত) সামান্য নিচু হওয়ায় জোয়ারের সময় এটি তলিয়ে যায়। তাই ভাটার সময় হেঁটে ছেঁড়া দ্বীপে যাওয়া গেলেও জোয়ারের সময় নৌকা নিয়ে যেতে হয়। সবচেয়ে ভালো হয় উত্তর প্রান্ত থেকে পশ্চিম বিচ ধরে সম্পূর্ণ পথ পায়ে হেঁটে গেলে। নির্জন এই পথটা অসম্ভব সুন্দর। প্রায় একঘন্টা সময় সেখানে অতিবাহিত করে আমরা সবাই আবার ইঞ্জিন নৌকা দিয়ে সেন্ট মার্টিন ফিরে এসে লাঞ্চ পর্ব শেষ করে আবার জাহাজ ধরার জন্য অপেক্ষায় থাকি। প্রায় সাড়ে তিনটার দিকে জাহাজে উঠে নিজ বাসভুমের দিকে রওয়ানা দিই। বংগোপ সাগরের বুক ছিড়ে জাহাজ প্রায় ছয় ঘন্টা চলে আবার বিআইডাব্লিউটিএ ঘাটে পৌঁছতে প্রায় রাত এগারটা বেজে যায়। এগারটার দিকে আমাদের জন্য জাহাজ ঘাটে অবস্থানরত সী লাইন বাসটিতে উখিয়ায় যারা যাবে তারা উঠে কক্সবাজার যারা থাকবে তারা সিএনজি যোগে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে যায়। সী লাইনে করে প্রায় সাড়ে বারটার দিকে আমরা উখিয়ায় নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছে যায়। এভাবে ঐতিহ্যবাহী উখিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি ব্যাচ-১৯৯২ এর “প্রমোদ ভ্রমণ, নৌবিহার ও পুনর্মিলনী এবং সেন্টমার্টিন দর্শন” অনুষ্টান পর্বের পরিসমাপ্তি ঘটে।

আকাশের নীল আর সমুদ্রের নীল ঠিক আলাদা করা যায়না নিমিষেই। দুটোই সমান পাল্লা দিয়ে চোখ তাতিয়ে দিচ্ছে অনবরত। নারকেলগাছ, পাথর, শৈবাল, সমুদ্রেরনীল তরংগ ও সাগরের তর্জন, গর্জন যে এত সুন্দর, এত ভাল লাগতে পারে, সেটা সেন্টমার্টিন না গেলে অজানা থেকে যেত। ঘাটে বাঁধা নৌকো দুলছে ঢেউয়ে ঢেউয়ে। হালকা বাতাস চুল, ঘাড়, কানে সুড়সুড়ি দিয়ে পালাচ্ছে। বালু, পাথর, প্রবাল কিংবা জীববৈচিত্র্যের সমন্বয়ে যেন বিজ্ঞানের এক ব্যবহারিক ক্লাস। কাচের মতো স্বচ্ছ পানিতে জেলি ফিশ, হরেক রকমের সামুদ্রিক মাছ আর কচ্ছপের ঘোরাফেরা। অনেকটা অ্যাকুরিয়ামের পানিতে সাঁতরে বেড়ানো মাছের মতো। তাই বলি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য পিপাসু ,ভ্রমণবিলাসী মানুষের দেহ-মন, শারীরিক দৃঢ়তা বৃদ্ধির অন্যতম নৈসর্গিক স্থান সেন্টমার্টিন। সবাইকে ধন্যবাদ।

আইকেন নিউজ/আ র/২০২১০২১৮


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর....