স্বাধীনতা দিবসে বাংলাদেশ দলের কাছে উজ্জীবিত পারফরম্যান্সের প্রত্যাশা নিয়েই ভোরবেলা টিভির পর্দার সামনে বসেছিলেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। কিন্তু দেখতে মিলল ঠিক উল্টোটা। তবু শুরুটা ছিল আশা জাগানিয়া। রুবেল-তাসকিনের আগুন ঝরানো বোলিংয়ে শুরুতে কিউইদের ঠিকই চেপে ধরেছিল বাংলাদেশ।

কিন্তু এরপর ধীরে ধীরে শুধু ম্যাচ থেকে ছিটকেই পড়েছে সফরকারীরা। ওয়েলিংটনে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ম্যাচে শেষপর্যন্ত বাংলাদেশ দল হেরেছে ১৬৪ রানের বড় ব্যবধানে। নিউজিল্যান্ডের করা ৩১৮ রানের জবাবে ব্যাখ্যাতীত ও উদ্দেশ্যহীন ব্যাটিংয়ের প্রদর্শনী করে ১৫৪ রানে অলআউট হয়েছে বাংলাদেশ।

যে উইকেটে ক্যারিয়ারের প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছেন ডেভন কনওয়ে ও ড্যারেল মিচেল, আরামের সঙ্গে খেলেছেন মোস্তাফিজুর রহমান, রুবেল হোসেন, তাসকিন আহমেদের বল; সেই একই উইকেট যেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের হয়ে যায় মাইনফিল্ড। যেখানে দাঁড়িয়ে থাকাও হয়ে পড়ে কষ্টের কাজ।

৩১৯ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র ২৬ রানেই সাজঘরে ফিরে যান টপঅর্ডারের তিন ব্যাটসম্যান তামিম ইকবাল (১), সৌম্য সরকার (১) ও লিটন দাস (২১)। তিন ম্যাচ মিলে তামিম ৯২, সৌম্য ৩৩ ও লিটন সাকুল্যে করতে পেরেছেন মাত্র ৪০ রান। টপঅর্ডারে যখন এমন বেহাল দশা, তখন সেই দলের বিব্রতকর হোয়াইটওয়াশ হওয়াই যেন স্বাভাবিক ফল।

শুরুতে ৩ উইকেট হারালেও ঘুরে দাঁড়ানোর যথেষ্ঠ সুযোগ ছিল মুশফিকুর রহীম, মোহাম্মদ মিঠুন ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদদের সামনে। কিন্তু জয়ের যেন কোনো ইচ্ছাই ছিল না দলের এই স্বীকৃত ব্যাটসম্যানদের। ওভারপ্রতি রানের চাহিদা যখন ছিল প্রায় সাড়ে ছয় করে, তখন টানা ৮৮টি বল কোনো বাউন্ডারি হাঁকাননি মুশফিক ও মিঠুন।

শুরুর ধাক্কা সামাল দিতে গিয়ে চতুর্থ উইকেটে ২২ রান যোগ করতে এ দুজন মিলে খেলে ফেলেন ৬৬টি বল। ততক্ষণে রানের চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় ওভারপ্রতি প্রায় সাড়ে ৮ করে। দলীয় পঞ্চাশের আগেই মিঠুনের বিদায়ের পর খানিক হাত খুলে খেলার চেষ্টা করেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। তিন ওভার থেকে দ্রুত ২৪ রানও পেয়ে যায় বাংলাদেশ।

কিন্তু মুশফিক যেন ছিলেন পুরোপুরি টেস্টের মেজাজে। একের পর এক বল ছেড়ে দেয়া এবং কাইল জেমিসনের বিপক্ষে পরাস্ত হয়ে শেষপর্যন্ত তিনি থামেন ৪৪ বলে ২১ রান করে। মুশফিক আউট হওয়ার সঙ্গেই শেষ হয়ে যায় সকল আশা। অবশ্য তিনি যতক্ষণ উইকেটে ছিলেন তখনও একবারের জন্যও মনে হয়নি জয়ের চেষ্টা রয়েছে তার ব্যাটিংয়ে।

হতাশ করেন দুই মেহেদি। প্রথমে মেহেদি হাসান মিরাজ ফেরেন খালি হাতে, পরে শেখ মেহেদি হাসান আউট হন ৩ রান করে। ফলে মাত্র ৮২ রানে ৭ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। শঙ্কা যখন একশর নিচে অলআউট হওয়ার, তখন বোলাররা যেন হয়ে ওঠেন নিখাঁদ ব্যাটসম্যান। জয়ের সকল আশা শেষ হওয়ার পর পরাজয়ের ব্যবধান কমানোর দিকেই মনোযোগী হন মাহমুদউল্লাহ ও বাকি বোলাররা।

প্রথম ৭ উইকেটে ৮২ রান করা বাংলাদেশ দল শেষের ৩ উইকেটেই পেয়েছে ৭২ রান। যেখানে তাসকিন আহমেদ ২৪ বলে ৯ ও রুবেল হোসেন ২৮ বলে ৪ রান করে বড় অবদান রেখেছেন। বাকি রান অবশ্য করেছেন মাহমুদউল্লাহই। অর্থহীন ইনিংসে তিনি তুলে নিয়েছেন ক্যারিয়ারের ২৩তম ফিফটি। শেষপর্যন্ত অপরাজিত থেকেছেন ৭৩ বলে ৬ চার ও ৪ ছয়ের মারে ৭৬ রান করে।

নিউজিল্যান্ডের পক্ষে বল হাতে একাই ৫ উইকেট নিয়েছেন পেস বোলিং অলরাউন্ডার জিমি নিশাম। এছাড়া ৪ উইকেট শিকার করেছেন ম্যাট হেনরি। বাকি ১ উইকেট নিজের পকেটে পুরেছেন কাইল জেমিসন।

এর আগে ডেভন কনওয়ে ও ড্যারেল মিচেলের ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি ৩১৮ রানের বড় সংগ্রহ দাঁড় করায় নিউজিল্যান্ড। যা কি না বেসিন রিজার্ভ মাঠে সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহের রেকর্ড। এছাড়া পঞ্চম উইকেটে এ মাঠের সর্বোচ্চ ১৫৯ রানের জুটি গড়েন কনওয়ে (১২৬) ও মিচেল *১০০*)।

বেসিন রিজার্ভে টস জিতে ব্যাট করতে নেমে শুরুতে সহজেই রান তুলতে থাকেন দুই ওপেনার হেনরি নিকলস ও মার্টিন গাপটিল। তাসকিন আহমেদ বেশ কিছু ভালো ডেলিভারি করলেও রানের চাকা আটকাতে পারেননি। যার ফলে প্রথম ছয় ওভার থেকে ৩৩ রান করে ফেলে নিউজিল্যান্ড।

সপ্তম ওভারে প্রথমবারের মতো বোলিং আক্রমণে পরিবর্তন আনেন তামিম ইকবাল, বল তুলে দেন রুবেল হোসেনের হাতে। আর এতেই আসে সাফল্য। রুবেল ও তাসকিনের গতিময় বোলিংয়ের সামনে রীতিমতো খাবি খেতে শুরু করেন কিউই ব্যাটসম্যানরা। রুবেলের প্রথম ওভারে আসে ৭ রান।

তবে এর পরের ওভারেই তাসকিন দেখান তার জাদু। দ্বিতীয় বলে এগিয়ে মারতে গিয়ে আউটসাইড এজ হন নিকলস। কিন্তু সেটি নিজের গ্লাভসে রাখতে পারেননি মুশফিক। উল্টো বল চলে যায় বাউন্ডারিতে। জীবন পাওয়ার সঙ্গে বোনাস চারটি রানও যোগ হয় নিকলসের নামের পাশে।

অবশ্য সৌভাগ্যে ভর করে বেশি দূর যেতে পারেননি বাঁহাতি নিকলস। সে ওভারের চতুর্থ বলে আবারও বাইরের কিনারায় লাগে বল। এবার চলে যায় গালি অঞ্চলে। যেখানে কোনো ভুল করেননি লিটন। তার নিরাপদ হাতে ধরা দিয়ে সাজঘরের পথ ধরেন ১৮ রান করা নিকলস।

তাসকিন উইকেটের খাতা খোলার পরের ওভারে আরেক ওপেনার গাপটিলকে ফেরান রুবেল। তার হালকা লাফিয়ে ওঠা ডেলিভারিতে পুল শটের চেষ্টা করেন গাপটিল। কিন্তু টাইমিংয়ে হয় গড়বড়, বল চলে যায় মিডঅফে। যেখানে প্রস্তুত ছিলেন লিটন। আবারও ক্যাচ নিয়ে ফেরান ২৬ রান করা গাপটিলকে।

দুই ওপেনারকে ফেরানোর পর আসে এক ওভার বিরতি। দশ ওভার শেষে নিউজিল্যান্ডের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২ উইকেটে ৫১ রান। এগারতম ওভারের চতুর্থ বলে শর্ট মিডঅনে দাঁড়ানো মোস্তাফিজুর রহমানের হাতে ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন অভিজ্ঞ রস টেলর। কিন্তু অতি দ্রুত আসায় সেটি ধরতে পারেননি মোস্তাফিজ।

জীবন পেয়ে ঠিক পরের বলেই চার মেরে দেন টেলর। অবশ্য এতে সমস্যা হয়নি। ওভারের শেষ বলটিতে টেলরকে উইকেটের পেছনে সহজ ক্যাচে পরিণত করেন রুবেল। এবার আর ভুল করেননি মুশফিক। তার হাতে ধরা দিয়ে সাজঘরে ফেরেন নিউজিল্যান্ডের অভিজ্ঞতম ব্যাটসম্যান।

এরপর আবার দ্বিতীয় ম্যাচের মতো বাংলাদেশের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ান টম লাথাম ও ডেভন কনওয়ে। দুজন মিলে স্বাচ্ছন্দ্যে রান তুলতে থাকেন। বিশেষ করে মোস্তাফিজুর রহমানের করা ১৯তম ওভারে পরপর তিন চারসহ মোট ১৪ রান তুলে নেন কনওয়ে। পরের ওভারে চার মেরে ২০ ওভারেই পূরণ করেন দলীয় শতক।

নিয়মিত বোলারদের দিয়ে জুটি ভাঙতে না পারায় ইনিংসের ২৪তম ওভারে পার্টটাইমার সৌম্য সরকারের দ্বারস্থ হন তামিম, সাফল্য পান হাতে নাতে। বল হাতে নিয়ে নিজের প্রথম বলেই মূল্যবান ব্রেকথ্রু দেন সৌম্য। এতে অবশ্য বড় অবদান গালিতে দাঁড়ান ফিল্ডার মেহেদি মিরাজের।

সৌম্যর অফস্ট্যাম্পের বাইরের বলটি ড্রাইভ করেছিলেন কিউই অধিনায়ক লাথাম। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ব্যাট ঘুরে যাওয়ায় বল চলে যায় গালি অঞ্চলে। সেখানে নিজের বাম দিকে বাজপাখির মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে বলটি তালুবন্দী করেন মিরাজ। ফলে বিদায়ঘণ্টা বাজে ৩৩ বলে ১৮ রান করা আগের ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান লাথামের।

এরপর আর মেলেনি সাফল্য। জিমি নিশামকে নিচে রেখে ড্যারেল মিচেলকে প্রমোশন দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় নিউজিল্যান্ড। যা কাজে লেগে যায় পুরোপুরি। ইনিংসের মাঝপথ পেরুনোর আগেই ৪ উইকেট হারালেও কনওয়ে-মিচেলের রেকর্ডগড়া জুটিতেই বিশাল সংগ্রহ দাঁড় করাতে পেরেছে কিউইরা।

ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি করেছেন কনওয়ে, প্রথম ফিফটির দেখা পেয়েছেন মিচেল। ইনিংসের ৪৩তম ওভারে বাউন্ডারি হাঁকিয়ে সেঞ্চুরিতে পৌঁছান কনওয়ে। এরপর ব্যক্তিগত ১০৫ রানের মাথায় তাসকিনের বলে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের হাতে ক্যাচ দিয়েও বেঁচে যান তিনি।

জীবন পাওয়ার পর আরও ২১ রান করেন কনওয়ে। দলীয় ২৭৯ রানের সময় তাকে সাজঘরে পাঠান মোস্তাফিজ। ডিপ মিড উইকেটে দাঁড়িয়ে ক্যাচ ধরতে ভুল করেননি আফিফ হোসেন ধ্রুব। যার ফলে সমাপ্তি ঘটে কনওয়ের ১১০ বলে ১৭ চারের মারে ১২৬ রানের ইনিংসের।

কনওয়ের বিদায়ে ভাঙে ১৫৯ রানের পঞ্চম উইকেট জুটিও। বেসিন রিজার্ভে যেকোনো উইকেটে এটিই সর্বোচ্চ রানের জুটি। ফলে ইনিংস শেষ করার দায়িত্ব বর্তায় মিচেলের কাঁধে। এর মাঝে জিমি নিশাম ৪ বলে ৪ রান করে আউট হন। তবে থামেননি মিচেল। মারমুখী ব্যাটিংয়ে দলকে ৩০০ পার করান তিনি।

শেষ ওভারে তার ব্যক্তিগত সেঞ্চুরির জন্য প্রয়োজন ছিল ১৭ রান। প্রথম তিন বলে তিন চার হাঁকিয়ে ৯৫ রানে পৌঁছে যান তিনি। পরের দুই বল থেকে নেন আরও ৩ রান। ইনিংসের শেষ বলে বাকি থাকা ২ রান নিয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম ফিফটিকে সেঞ্চুরিতে রূপ দেন ২৯ বছর বয়সী এ অলরাউন্ডার। শেষপর্যন্ত ৯২ বলে বলে ঠিক ১০০ রানে অপরাজিত থাকেন মিচেল। নিউজিল্যান্ডের সংগ্রহ থেমেছে ৬ উইকেটে ৩১৮ রানে।

বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ৩ উইকেট নিয়েছেন রুবেল হোসেন। এছাড়া একটি করে উইকেট নিয়েছেন মোস্তাফিজ, তাসকিন ও সৌম্য। দশ ওভারে ৮৭ রান খরচ করেছেন ফিজ। যা তার ক্যারিয়ারে সবচেয়ে রান খরচের রেকর্ড।