• রবিবার, ১৩ জুন ২০২১, ০৫:১৫ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
যখন আমি প্রকৃতির নিয়মে বুড়িয়ে যাবো সবই তাঁর দান, সুমহান! জানেন, পুত্র সন্তান জন্মালেই কেন পিতার হাতে খুন হতে হয় নির্মমভাবে! উখিয়ায় রাজাপালং ইউনিয়ন ছাত্রলীগের উদ্যোগে ঐতিহাসিক ৬ দফা দিবস পালিত মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জোয়ান কতৃক, ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ রোহিংগা নাগরিক ধৃত উখিয়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু বক্কর ছিদ্দিককে হাজার মানুষের ভালবাসা ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন উখিয়ায় পাহাড়ধ্বস প্রবণ এলাকায় ইউএনও’র সতর্কতা, জরুরী প্রয়োজনে 01882160082 পানি নিষ্কাশনের একমাত্র ড্রেনেজটি বন্ধ করে দেওয়ায়, উখিয়ার মালভিটা পাড়ার শত শত ঘর বাড়ি কোমর পানিতে সয়লাব ” ১১নং মঘাদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী শাহীনুল কাদের চৌধুরী। বাংলাদেশে সংক্রমণের ৮০ শতাংশই ভারতীয় ধরন

ইসলামিক ‘রোজা’ ও বৈজ্ঞানিক ‘অটোফেজি’ শব্দের অর্থ, সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য।

admin / ৭৯ মিনিট
আপডেট বৃহস্পতিবার, ৬ মে, ২০২১

এম আর আয়াজ রবি।

‘রোজা’ একটি ফার্সি শব্দ। এর আরবী প্রতিশব্দ ‘সিয়াম’ বা ‘সাওম’ যার অর্থঃ বিরত থাকা, আত্মসমর্পন করা, দহন করা, জ্বালিয়ে দেয়া ও পুঁড়িয়ে ফেলা। ইসলামি শরীয়তের পরিভাষায় ‘সাওম’ হল- সুবহে সাদিক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত, শুধু মাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় খাস নিয়তের সাথে পানাহার, দৈহিক ও শারীরবৃত্তীয় চাহিদাসহ যাবতীয় অন্যায় কাজ থেকে নিজেকে ফিরিয়ে নেয়া, সংযত রাখা বা রক্ষা করা এবং আল্লাহর দেওয়া সংবিধান আল কোরান ও হাদিসের পথে নিজকে পরিচালিত করার দীক্ষা গ্রহন করার অনুশীলন করা । রোজার মাধ্যমে মানুষ যাবতীয় খারাপ কাজ, কু-প্রবৃত্তি থেকে নিজকে রক্ষা করে, নিজের দেহে জমাকৃত সকলআবর্জনা ধ্বংস করে, পুড়ে ফেলে। না হলে, ঐসব বিষাক্ত পদার্থ শরীরে বিভিন্ন রোগের জন্ম দিত।

রোজা সম্পর্কে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন-আল্লাহ্‌ তাআলা বলেনঃ “বনী আদমের প্রত্যেকটি আমলই তার নিজের জন্যে, অবশ্য রোযা ব্যতীত ! কারণ, রোযা অবশ্যই আমার জন্য । এবং এর পুরষ্কার আমার নিজের হাতে দিবো । রোযা হল একটি ঢাল । আর তোমাদের কেউ যখন রোযার দিনে উপনিত হবে, সে অশ্লীলতা ও পাপাচারে লিপ্ত হবে না; চিৎকার বা শোরগোল করবেনা । বরং কেউ যদি তাকে গালি দেয় বা তার সাথে লড়াই করে, তবে সে যেন বলেঃ “আমি অবশ্যই রোযাদার ব্যক্তি ।”(হাদীসে কুদসী / সহীহ বুখারীঃ১৯০৪)

রোজার উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ ভীতি জাগ্রত হওয়া, তাকওয়া অর্জন করা, আল্লাহর যাবতীয় আদেশ নিষেধ মেনে চলা ও কু-প্রবৃত্তির হাত থেকে নিজের নফসকে হেফাজত করা। আল্লামা ইবনুল কাইয়িম (রঃ) বলেন, ‘রোজার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে তার পাশবিক ইচ্ছা ও জৈবিক অভ্যাস থেকে মুক্ত করা এবং জৈবিক চাহিদার মধ্যে সুস্থতা ও স্বাভাবিকতা প্রতিষ্ঠা করা।’

রোজা পালনের মাধ্যমে মানুষ আত্মশুদ্ধি ও পবিত্রতা অর্জন করে। শারীরিক ও আত্মিক উন্নতি সাধন করে। বস্তুত রোজা মহান আল্লাহ ও তার বান্দার মাঝে এমন ৩০ দিনের তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতিকে জাগ্রত করান, যা মনে প্রানে আমলে নিয়ে, বাকী এগার মাস রমজানের শিক্ষায় প্রশিক্ষন প্রাপ্ত হয়ে নিজের জীবন অতিবাহিত করার পাথেয় খুজে পাওয়ার মাধ্যম। রোজা মানুষ ও সৃষ্টি কর্তার মধ্যেএক সেতু-বন্ধন রচনা করে, যা কেবল স্রষ্টা ও সৃষ্টির সম্পর্ককে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর করে।

এ রোজা পালন শুধু একটা ফরজ আদায়-ই নয়। বরং মানবজীবনে রোজা পালনের স্বার্থকতা অনেক। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মাঝে কেউ যদি রমজান মাস পায় তাহলে সে যেন রমজানের রোজা রাখে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)
পবিত্র রমজান মাসে রোজা পালনের মাধ্যমে মানবজীবনের প্রথম স্বার্থকতাই হলো মহান আল্লাহর আদেশ পালন করা। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি শুধু আল্লাহ পাকের খুশি ও আখেরাতের মুক্তির আশায় রোজা রাখে, আল্লাহ তায়ালা তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ মাফ করে দেন।’ (বুখারি: ১/২৫৫)
এখান থেকে বুঝা যায় একনিষ্ঠ খাটি নিয়তে রোজা রাখলে, মহান আল্লাহ পাক রোজাদারের পূর্ববর্তী সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন। অতএব বলা যায় রোজা পালনে মানবজীবনের আরও একটি স্বার্থকতা হলো, পূর্ববর্তী সব গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়া। ইবাদতের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী শত্রুদের মাঝে ‘নফসে আম্মারা’ অন্যতম। আল্লাহ তা’আলা বলেন- “নিশ্চয়ই নফসে আম্মারা মন্দ কাজের নির্দেশদাতা।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৩)

স্বাভাবিকভাবেই মনে কৌতুহল জাগে ‘নফসে আম্মারা’ জিনিসটা কী? ‘নফসে আম্মারা’ হচ্ছে প্ররোচক ও প্রলুব্ধকারী প্রবৃত্তি, এককথায় বলা যায় কু-প্রবৃত্তি। এই নফস ব্যক্তিকে এমনভাবে বশীভূত করে যে ব্যক্তির নিজের ওপর কোনো রকম নিয়ন্ত্রণ থাকে না, তার প্রবৃত্তি যা আদেশ করে সে তা-ই সম্পাদন করে, যার ওপর শয়তানের প্রবল প্রভাব বিরাজমান থাকে। ফলে এ নফস ব্যক্তিসত্তাকে সব ধরনের অন্যায়, অপকর্ম ও মন্দ পথের দিকে ধাবিত করে। সোজা কথায় নফসে আম্মারায় আবেষ্টিত ব্যক্তিসত্তার মধ্যে এমন একটা মনোভাব থাকে যে পাপ আবার কী? নফসে আম্মারাধারী ব্যক্তি মৃত্যুর পর যে পুনরুত্থিত হয়ে শেষ বিচারের মুখোমুখি হতে হবে, তা যেন সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে থাকে !

যে ব্যক্তি নফসে আম্মারাকে শায়েস্তা করতে পারে, সে অতি সহজেই ইসলামের বিধানাবলি পালন করতে পারে। নফসে আম্মারাকে শায়েস্তা করার জন্য রোজা একটি অব্যর্থ ওষুধ নয় শুধু মহাঔষধও বটে! ইমাম গাজালি রহ. বলেন, ‘নফসে আম্মারা সাপের মতো এবং রোজা এর প্রতিষেধক। তাই মানব জীবনে রোজা পালনের মাধ্যমে নফসে আম্মারা দমন করে ইবাদতে মনোযোগী হওয়া সম্ভব।’

গ্রীক শব্দ “Autophagy” শব্দটি ‘Auto’ অর্থ নিজে এবং ‘phagy’ অর্থ খাওয়া নিয়ে গঠিত। সুতরাং, ‘Autophagy’ বা ‘অটোফেজি’ অর্থ নিজে, নিজেকে খেয়ে ফেলা বা আত্মভক্ষণ করা ! নিজে নিজেকে খেয়ে ফেলা বিষয়টি চিন্তা করলে মনে হয় খুবই ভয়ানক একটা অবস্থা ! বিষয়টি শুনতে ভয়ানক মনে হলেও এটা শরীরের জন্য খুবই উপকারি একটি প্রক্রিয়া। কেননা এটা শরীরের আভ্যন্তরীণ অঙ্গসমূহকে পরিষ্কার করার একটা প্রক্রিয়া-যা সম্পন্ন হয় মানবদেহের কোষীয় পর্যায়ে (জীবদেহের গঠন ও কাজের একক হছে কোষ) । মজার ব্যাপার হচ্ছে- এই আত্মভক্ষণ কোষের কোন ক্ষতি করে না বরং কোষকে সজীব রাখতে সাহায্য করে। যদি এই আত্মভক্ষন প্রক্রিয়াতে কোন সমস্যা হয়, তবে শরীরে নানা রকম রোগের উৎপত্তি হতে পারে।
আমাদের শরীরের বিভিন্ন কাজ করার জন্য প্রতিনিয়ত প্রোটিন তৈরি/সংশ্লেষ হয় এবং এই তৈরি হওয়া প্রোটিনের কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করার জন্য তার (প্রোটিনের) গঠনটি অ্যামিনো এসিড দ্বারা ত্রিমাত্রিক হতে হয়। যদি ত্রিমাত্রিক গঠন না হয় তবে প্রোটিনটি শরীরের জন্য ক্ষতিকারক হতে এবং নানা রোগের সৃষ্টি করবে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানব শরীরের ৩০% প্রোটিন সঠিকভাবে সংশ্লেষ হতে পারেনা, ফলে এদেরকে ধ্বংস করা, শরীর থেকে বের করে দেওয়া কিংবা অন্য উপায়ে কাজে লাগানো জরুরি হয়ে পড়ে, কেননা শরীরে এরা থাকলে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হবে। তাই মানব শরীরের অটোফেজি প্রক্রিয়া এরকম ক্ষতিকারক প্রোটিনকে ধ্বংস করে বা কোষ গঠনে কাজে লাগায়।

অটোফেজি ও রোজার মধ্যে সাদৃশ্যঃ

১৯৫০ দশকের মাঝামাঝি বিজ্ঞানীরা দেখতে পেলেন কোষের অভ্যন্তরে সাইটোপ্লাজমের সাইটোসলে (Cytosol) এক ধরনের অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠ রয়েছে, যার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের এনজাইমও আছে। বিজ্ঞানীগন তখন এই প্রকোষ্ঠটির নাম দেন ‘লাইসোজোম’ যা বিজ্ঞানীদের কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ । কেননা মানুষের প্রায় ৪০টি বংশগত রোগের সঙ্গে লাইসোজোমে থাকা এনজাইমের ত্রুটির সম্পর্ক রয়েছে।এটা আবিস্কারের ফলে বেলজিয়ান বিজ্ঞানী ‘Christian de Duve’ ১৯৭৪ সালে নোবেল বিজয়ী হন।

অটোফেজি শব্দটির উৎপত্তি হয় আজ থেকে প্রায় ৫৪ বছর আগে, তবে বিশ্ববাসী এটা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারে ২০১৬ সালে। লাইসোজোমে কি ঘটে তা বিজ্ঞানীদের কাছে পরিস্কার ধারনা ছিলনা। ‘ডে দুভে’ এর আবিষ্কারের হাত ধরে ১৯৬৩ সালে “অটোফেজি” শব্দের উৎপত্তি হয়। ‘ডে দুভে’র আবিষ্কারের পর কয়েক দশক পর্যন্ত খুব নগণ্য পরিমাণ কাজ হয় অটোফেজি নিয়ে। এর প্রধান কারণ অটোফেজি তখন কেবল কোষের আবর্জনা নিষ্কাশন পদ্ধতি হিসেবেই পরিচিত ছিল। এর কৌশল, প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোন প্রকার মাথা ঘামাতে চেষ্টা করেনি কেউ। জাপানের শরীর বিজ্ঞানী ‘ইওশিনোরি ওসুমি’এর আবিস্কারটা ছিল লাইসোজোম নামক প্রকোষ্ঠটির কাজ এর উপর এবং কিভাবে এটা আমাদের দেহের ক্ষতিকারক প্রোটিনকে ধ্বংস করে বা কাজে লাগায় সেই ক্রিয়া-কৌশল নিয়ে। ওসুমির গবেষনার ফলশ্রুতিতে অটোফেজি নিয়ে গবেষনার দ্বার উন্মোচিত হয়। পরবর্তী গবেষকগণ অটোফেজি প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাতের সাথে পারকিন্সন্স, আ্যলজাইমারস, ক্যান্সারের মত রোগের সূত্রপাত জড়িত তা প্রমান করেন। অটোফেজি কৌশল ব্যাখ্যা ও নতুন গবেষনা দ্বার উন্মোচনে ওসুমির অসামান্য অবদান কে স্বীকার করে তাকে ২০১৬ সালের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়।

‘রমজান’ শব্দটি আরবি ‘রমজ’ ধাতু থেকে উৎপত্তি। এর অর্থ দহন করা, জ্বালিয়ে দেয়া ও পুড়িয়ে ফেলা। রোজার মাধ্যমে এভাবে জমে থাকা আবর্জনা ধ্বংস না হলে, ওইসব বিষাক্ত পদার্থ শরীরে বিভিন্ন রোগের জন্ম দিত। অন্যদিকে, গ্রিক শব্দ থেকে আগত অটোফেজির অর্থ একই। এটার ওপর ভিত্তি করে অনেকে বলছেন, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে রোজা রাখাকে বলা হয় অটোফেজি;
রোজা সম্পর্কে আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘ওয়া আনতা সুউমু খাইরুল লাকুম ইনকুনতুম তা’লামুন’ অর্থাৎ ‘যদি রোজা রাখো তবে তাতে রয়েছে তোমাদের জন্য কল্যাণ, যদি তোমরা সেটা উপলব্ধি করতে পারো।’ (সূরা বাকারাহ : ১৮৪)। এ আয়াতে আল্লাহ রোজা পালনের নানাবিধ কী কী কল্যাণের প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন? দুনিয়াতে আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের নিছক কষ্ট দেয়ার জন্য তা ফরজ করেননি। আসলে রমজানের এ বাহ্যিক উপকারিতার কথা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অনেক আগেই প্রমাণ করেছে।এ বিষয়টি এখন সর্বজনগ্রাহ্য একটি বাস্তবতা। আল্লাহ যেহেতু আমাদের জন্য এ বিধানটি দিয়েছেন, ফলে এতে যে অবশ্যই কল্যাণ নিহিত রয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক নিয়তে তাকওয়া অর্জনের জন্য রোজা রাখার তৌফিক দিন।
রোজার যাবতীয় উপকারগুলো মোটামুটি ৪ ভাগে ভাগ করা যায়- শারীরিক, মানসিক, আবেগীয় এবং আধ্যাত্মিক। আপনি যদি শুধু রোজার শারীরিক উপকারিতা চিন্তা করেন তাহলে রোজাকে অটোফেজির সঙ্গে তুলনা করতে পারবেন; রোজা সুস্থ জীবন লাভে সহায়ক। কিন্তু অনেকেরই ধারণা তারা একদিন উপবাস থাকলেই সহজে রোগাক্রান্ত হয়ে যায়। কারণ তাদের জীবনীশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান মতে সুস্থ জীবন লাভের জন্য খাওয়ার প্রয়োজন বেশি নয়। বরং কম ও পরিমিত খাওয়াই সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি। রমজান মাসে অন্য মাসের তুলনায় কম খাওয়া হয় এবং কম খাওয়া সুস্বাস্থ্যের অনুকূলে।
রোগ নিরাময়ের যতগুলো প্রতিকার এবং প্রতিষেধক আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও ফলপ্রসূ প্রতিকার হল রমজানের রোজা। ডা. জয়েলস এম ডি বলেছেন, ‘যখনই এক বেলা খাওয়া বন্ধ থাকে, তখনই দেহ সেই মুহূর্তটিকে রোগ মুক্তির কাজে নিয়োজিত করে। অধিক ভোজনের ফলে যে বিষক্রিয়া উৎপন্ন হয়, তা দেহের স্নায়ুকোষকে বিষাক্ত করে দেয়। ফলে দেহে এক অস্বাভাবিক রকমের ক্লান্তিবোধ এবং জড়তা নেমে আসে। যখন আমরা আহার বন্ধ করে রাখি এবং দেহযন্ত্রকে বিরতি দেই, তখন দেহে সংরক্ষিত জীবনী শক্তিতে প্রচণ্ডবেগে সঞ্চারিত হয়’।
রোজা দেহযন্ত্রের বিরতিকালে শরীরের অপ্রয়োজনীয় অংশ ধ্বংস করে এবং দেহের রোগ নিরাময় কাজে সংরক্ষিত প্রাণশক্তির সদ্ব্যবহার করে।পূর্ণ একমাস রোজার ফলে জিহ্বা ও লালা গ্রন্থিগুলো বিশ্রাম পায়, ফলে এগুলো সতেজ হয়। যারা ধুমপান করে তাদের জিহ্বায় ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল রোগ হবার আশঙ্কা বেশি থাকে। তাই একমাস রোজার সময় ধুমপায়ীরা ধুমপান কম করে বলে উক্ত আশঙ্কাজনক রোগের সম্ভাবনা খুবই কম থাকে। তাছাড়া একমাস রোজার ফলে জিহ্বায় খাদ্যদ্রব্যের স্বাদও বৃদ্ধি পায়। এটা বিশেষ করে তাদের জন্য যারা অত্যধিক ধুমপান করে ও পান খেয়ে জিহ্বায় খাদ্যদ্রব্যের স্বাদ হারিয়েছে।

অটোফেজি ও রোজার মধ্যে বৈসাদৃশ্যঃ
রোজা আর অটোপেজি দুটো এক নয়।পবিত্র কোরআনে এরশাদ হচ্ছে, ‘হে ঈমানদারগন! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর। যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’-(সূরা আল বাক্বারাহ: ১৮৩) আল্লাহ তায়ালা তাকওয়া অর্জনের নিমিত্তে যে ইবাদতটি আমাদের জন্য ফরজ করে দিয়েছেন, সেটা কত যে বিশাল বরকতময়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
রোজার যাবতীয় উপকারগুলো মোটামুটি ৪ ভাগে ভাগ করা যায়- শারীরিক, মানসিক, আবেগীয় এবং আধ্যাত্মিক। আপনি যদি শুধু রোজার শারীরিক উপকারিতা চিন্তা করেন তাহলে রোজাকে অটোফেজির সঙ্গে তুলনা করতে পারবেন; কিন্তু আমাদের রোজা রাখার উদ্দেশ্য যেন হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। কেননা তিনি এটা আমাদের ওপর ফরজ করে দিয়েছেন। আবার অবিশ্বাসীদের ধারণা, টানা এক মাস দিনের বেলা না খাওয়া, পান না করার নাম রোজা, আর শরীরকে কষ্ট দেয়াই রমজানের সাধনা। শুধু তাই নয়, অনেকে রোজাকে কষ্টের উপবাস হিসেবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে থাকে। তাদের এ ধারণা আসলে ভুল, সেটা আমরা অটোফেজির মাধ্যমে রোজা সম্পর্কে আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘ওয়া আনতা সুউমু খাইরুল লাকুম ইনকুনতুম তা’লামুন’ অর্থাৎ ‘যদি রোজা রাখো তবে তাতে রয়েছে তোমাদের জন্য কল্যাণ, যদি তোমরা সেটা উপলব্ধি করতে পারো।’ (সূরা বাকারাহ : ১৮৪)। এ আয়াতে আল্লাহ রোজা পালনের নানাবিধ কী কী কল্যাণের প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন? দুনিয়াতে আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের নিছক কষ্ট দেয়ার জন্য তা ফরজ করেননি। আসলে রমজানের এ বাহ্যিক উপকারিতার কথা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অনেক আগেই প্রমাণ করেছে। এ বিষয়টি এখন সর্বজন গ্রাহ্য একটি বাস্তবতা। আল্লাহ যেহেতু আমাদের জন্য এ বিধানটি দিয়েছেন, ফলে এতে যে অবশ্যই কল্যাণ নিহিত রয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক নিয়তে তাকওয়া অর্জনের জন্য রোজা রাখার তৌফিক দিন।
অনেকেই বলার চেষ্টা করেছেন-“মুসলিমরা রোজা রাখলে তাকে বলা হয় ’সিয়াম’। খ্রিস্টানরা রোজা রাখলে তাকে বলা হয় ’ফাস্টিং’। হিন্দু বা বৌদ্ধরা রোজা রাখলে তাকে বলা হয় ’উপবাস’।বিপ্লবীরা রোজা রাখলে তাকে বলা হয় ’অনশন’। আর, মেডিক্যাল সাইন্সে রোজা রাখকে বলা হয় ’অটোফেজি’”।

তবে মুসলিমদের রোজা রাখার ধরনের সাথে অটোফেজের মধ্যে অনেক কিছু পার্থক্য আছে। পার্থক্যগুলো স্পষ্ট, কেননা-মুসলিমের রোজার সাথে অন্য ধর্মাবলম্বীদের রোজার মূল পার্থক্য হচ্ছে- মুসলিমরা শুধু মাত্র আল্লাহর নির্ধারিত নিয়মে আল্লাহকে খুশী করার জন্য রোজাব্রত পালন করে থাকেন। এখানে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে গিয়েই শারীরিক অন্যান্য সু্যোগ সুবিধাগুলো প্রাপ্ত হচ্ছেন। অর্থাৎ এখানে মূখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্ঠি অর্জন করা।কিন্তু অটোপেজ করা হয় একান্ত নিজ শারীরবৃত্তীয় চাহিদা মেটানোর জন্য । এখানে স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের কোন উদ্দেশ্য থাকেনা।কেহ ইচ্ছে করলে বছরের যেকোন দিন অটোফেজ ব্রত পালন করতে পারেন কিন্তু রোজা পালন করতে হয় বছরের নির্দিষ্ট একটা মাসে, যে মাসে মুসলিমের সর্বোচ্চ ধর্মীয় গ্রন্থ আল কোরান অবতীর্ণ হয়েছে অর্থাৎ পবিত্র মাহে রমজান মাস।অটোফেজ যেকোন ব্যক্তি যেকোন সময় তার শারীরবৃত্তীয় চাহিদা পুরন করার নিমিত্তে যেকেহ চালু করতে পারেন। রোজাব্রত পালন করার সময় একটি নির্দিষ্ট সময় থেকে শুরু করে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা শেষ করতে হয় অর্থাৎ সুবেহ সাদিক থেকে সুর্যাস্ত পর্যন্ত অর্থাৎ রোজার মেয়াদ কাল থাকে ১২ ঘন্টা থেকে ২২ ঘন্টা। আবার অটোফেজ হয় দীর্ঘ ৬০ ঘন্টা ৭০ বা ৭২ ঘন্টা বা ততোধিক। রোজা অবস্থায় কোন কিছু পান করতে বা খেতে পারেনা, স্ত্রীসহবাস থেকে জৈবিক চাহিদা পুরন করার সুযোগ থাকেনা কিন্তু অটোফেজে তরল পদার্থসহ কিছু খাবার গ্রহন ও জৈবিক চাহিদা পুরনের কোন বাধা থাকেনা। খুব বেশি দিন হয়নি, মেডিক্যাল সাইন্স ’অটোফেজি’র সাথে পরিচিত হয়েছে। ২০১৬ সালে নোবেল কমিটি জাপানের ডাক্তার ’ওশিনরি ওসুমি’-কে অটোফেজি আবিষ্কারের জন্যে পুরষ্কার দেয়। এরপর থেকে আধুনিক মানুষ ব্যাপকভাবে অটোপেজ করতে চেষ্টা করছেন। কিন্তু রোজা চলে আসছে পৃথিবীর সৃষ্টি লগ্ন থেকে প্রায় সব নবী রাসুলের আমল থেকে। অবশ্য পুর্বে ইসলামে রোজার নিয়ম ছিল সুর্যাস্ত থেকে পরের দিনের সুর্যাস্ত পর্যন্ত। পুর্বে স্ত্রী সহবাস নিষিদ্ধ ছিল।পরে আল্লাহ সুবহে সাদিক থেকে সুর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়ম করে দিয়েছেন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর যুগে এবং রাত্রিকালে স্ত্রী সহবাস উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।

রোজা সম্পর্কে হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ) এর বেশ কিছু হাদিস আছে যা অটোজেমের মধ্যে তার লেসমাত্র অস্তিত্ব খুজে পাওয়া যায়না। যেমন-
(১) রোযা রাখা গোনাহের কাফফারা স্বরূপ এবং ক্ষমালাভের কারণঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াবের আশায় রামাদান মাসে রোযা রাখবে, তার পূর্বের সকল গোনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।’’ (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯১০ ও সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮১৭)
(২) রোযা জান্নাত লাভের পথঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘‘জান্নাতে একটি দরজা রয়েছে যাকে বলা হয় ‘রাইয়ান’। কিয়ামতের দিন এ দরজা দিয়ে রোযাদারগণ প্রবেশ করবে। অন্য কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। রোযাদারগণ প্রবেশ করলে এ দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে আর কেউ সেখান দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।’’ (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৭৯৭ ও সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭৬৬ )
(৩) রোযাদারের জন্য রোযা শাফায়াত করবেঃ উত্তম সনদে ইমাম আহমাদ ও হাকেম বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘‘রোযা এবং কুরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য শাফায়াত করবে। রোযা বলবে, হে রব! আমি তাকে দিবসে পানাহার ও কামনা চারিতার্থ করা থেকে নিবৃত্ত রেখেছি। অতএব, তার ব্যাপারে আমাকে শাফায়াত করার অনুমতি দিন।’’ (মুসনাদ, হাদীস নং ৬৬২৬, আল-মুস্তাদরাক, হাদীস নং ২০৩৬)
(৪) রোযাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মিসকের সুগন্ধির চেয়েও উত্তমঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘‘যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ তার শপথ! রোযাদারের মুখের গন্ধ কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে মিসকের চেয়েও সুগন্ধিময়।’’ (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৯৪ ও সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭৬২)
(৫) রোযা ইহ-পরকালে সুখ-শান্তি লাভের উপায়ঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘‘রোযাদারের জন্য দু’টো খুশীর সময় রয়েছে। একটি হলো ইফতারের সময় এবং অন্যটি স্বীয় প্রভু আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়ার সময়।’’ (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮০৫ ও সহীহ মুসলিম, হদীস নং ২৭৬৩)

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, রোজা ও অটোফেজি দু’টো ভিন্ন জিনিস কিন্তু উভয়ের মধ্যে কিছুটা সাদৃশ্য থাকলেও রোজার গুরুত্ব হচ্ছে অপরিসীম ও বহুবিধ। রোজা ও অটোফেজের মধ্যে শারীরবৃত্তীয় দিক থেকে কিছুটা মিল খুজে পাওয়া গেলেও উভয়ের ধরনের মধ্যে বেশ পার্থক্য রয়েছে। গবেষনায় পাওয়া যায়, রোজা রাখার ১৩ তম ঘন্টা থেকে ১৮ তম ঘন্টার মধ্যে অটোফেজি সক্রিয় হয়। অটোফেজি সাধারণভাবে উপবাসের ১৮ তম ঘণ্টা থেকে অটোফেজি সক্রিয় হয়। কোনো কোনো গবেষণায় অবশ্য দেখা গেছে যে, ১৩ তম ঘণ্টা থেকেও অটোফেজি সক্রিয় হয়েছে। কাজেই আমরা বলতে পারি যে, উপবাসের ১৩ তম থেকে ১৮ তম ঘণ্টায় গিয়ে আমাদের দেহে অটোফেজি প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়। সক্রিয় হয় তখন কোষের আবর্জনা ও ক্ষয়ে যাওয়া কোষ রিসাইক্লিং এবং নতুন কোষাণু তৈরি ও শক্তি উৎপাদন। এটি গেল শুধু রোজা ও অটোফেজির শারীর বৃত্তীয় প্রায়োগিক দিক কিন্তু রোজার মধ্যে মানসিক, আবেগীয় এবং আধ্যাত্মিক যে দিক বিদ্যমান তা কিন্তু অটোফেজির মধ্যে নাই বললেই চলে। তাই বলা চলে ইসলামিক ‘রোজা’ ও বৈজ্ঞানিক ‘অটোফেজ’ শব্দ দু’টোর মধ্যে ক্ষুদ্রার্থে শারীরবৃত্তীয় দিক থেকে কিছুটা মিল থাকলে ও মানসিক, আবেগীয় ও আধ্যাত্বিক দিক থেকে অমিল অনেক বিশাল। তাই বলতে হয় রোজা ও অটোফেজ ক্ষুদ্রার্থে শারীরবৃত্তীয়ভাবে মিল খুঁজে পাওয়া গেলেও বৃহদার্থে তেমন মিল খুঁজে পাওয়া যায়না।

লেখকঃ প্রেসিডেন্ট-বিএমএসএফ ( বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম) উখিয়া উপজেলা শাখা ও ভাইস-প্রেসিডেন্ট উপজেলা প্রেস ক্লাব, উখিয়া।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর....