• বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১, ০২:৪৩ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
ইউপি নির্বাচন এবং সমাজে তথাকথিত ইয়াবা সংশ্লিষ্ট কোটিপতি তকমাদারীর সামাজিক অবস্থান ! ঘুংধুম আজুখাইয়ায় বাল্য বিয়ের বলী হলেন হুমায়রা নামক এক গৃহবধু উখিয়ায় ষোড়শীর বিষপান, স্ত্রীকে হাসপাতালে রেখে স্বামীর পলায়ন উখিয়ায় মুহিবুল্লাহ হত্যাকান্ড || সন্দেহজনক এক আরসা নেতা নাইক্ষ্যংছড়িতে গ্রেফতার ইউপি নির্বাচনের প্রার্থিতা নিয়ে সংঘর্ষ, নিহত ৪ অপহরণের ৪ দিন পর রোহিঙ্গা যুবক উদ্ধার উখিয়ায় মর্মান্তিক ট্রাক দুর্ঘটনায় হেল্পার নিহত, ড্রাইভার আহত মরিচ্যা চেকপোস্টে সাড়ে ৮২ হাজার ইয়াবাসহ আটক ৬ উখিয়া উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক ঘোষিত ষ্টেশন ও বাজার সম্বলিত সড়ক, মহাসড়কে সৃষ্ট যানজট নিরসনে দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি নেই । আজকের দিনে সাংবাদিক হওয়া কঠিন, বিপজ্জনক: মারিয়া রেসা

করোনায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের চাপা কান্না, যেন দেখার কেউ নেই !

admin / ১৫৫ মিনিট
আপডেট বুধবার, ২৩ জুন, ২০২১

এম আর আয়াজ রবি

“চট্রগ্রাম শহর আইসায় আমার আশা ফুরাইছে (পুরাইছে), মনের আশা ফুরাইছে (পুরাইছে)”! হ্যাঁ চট্রগ্রাম শহর এসে আজ করোনা ভাইরাস সব আশা শেষ করে দিয়েছে ! হাজার হাজার মানুষ অজ পাড়া গ্রাম থেকে পাড়ি জমিয়েছিল স্বপ্নের চট্রগ্রাম শহরে। সবার মনে অনেক আশা, অনেক স্বপ্ন নিয়ে দূরু দূরু বুকে একদিন স্বপ্নের চট্রগ্রাম শহরে আগমন ঘটেছিল। কেহ নিজে পড়া লেখা করার জন্য, কেহ সন্তান সন্তুতির পড়া লেখার নিমিত্তে, কেহ ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য বা কেহ ভাগ্য বিড়ম্বনার শিকার হয়ে! কারন এই চট্রগ্রাম শহরে বড় বড় গার্মেন্টস, রপ্তানী প্রক্রিয়াকরন জোন, ব্যাঙ্ক, বীমা, অফিস, আদালতসহ মানুষের কর্ম সংস্থানের ক্ষেত্র যেমন সৃষ্টি হয়েছিল, তেমনি বড় বড় নামকরা সব স্কুল,কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সমুহ গ্রামের একটু সচেতন মানুষকে চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে এসেছিল এ যান্ত্রিক শহরে। অনেকেই পরিবার পরিজন নিয়ে পাঁচ বছর, দশ বছর, বিশ বছর, ত্রিশ বছর, চল্লিশ বছর বা ততোধিক সময় অতিবাহিত করেছেন এই ইট পাথরের ঘেরা ইমারতে। এক সময় যে অজ পাড়া গাঁ থেকে স্বপ্নের শহরে এসেছিল তারা কিন্তু অনেকেই সেই গ্রামকে ভুলে যেতে বসেছিল, বা অনেকেই ভুলার পথে ছিল ! আবার অনেকেই তাদের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন এই শহুরে জীবনে।

‘বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ’। এখন গ্রামে গঞ্জে যে উন্নয়ন তাতে আবেগ দেখাবার ও সুযোগ নেই। বিজ্ঞানের বদৌলতে গ্রাম আগের সেই শ্রী বিমূখ হতশ্রী, গন্ড, মূর্খ গ্রাম অবস্থায় আর নেই। দেশের সামষ্টিক উন্নয়নের ছোঁয়া গ্রামের অলিতে গলিতে এখন দৃশ্যমান। বিজ্ঞানের অপ্রতিরোধ্য কল্যাণে ও দেশে নিয়মতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার কারনে গ্রাম এবং শহরের মধ্যে পার্থক্য অনেকটুকু কমে এসেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের কল্যাণে আজ গ্রামের মানুষও শহুরে জীবনের অনেক সুযোগ সুবিধা ভোগ করে যাচ্ছেন। এক সময় শোনা যেত ৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে।এখন ৬৮ হাজার গ্রাম থেকে লাখের উপরে গ্রাম হবে নিশ্চয়ই। সব গ্রাম বেঁচে গেছে মিন্স বাংলাদেশ বেঁচে আছে, এটাই স্বাভাবিক। এটাই গ্রাম অবকাঠামোর উন্নয়নের বহিঃপ্রকাশ।
দু দশক, চার দশক বা ততোধিক সময়েও যদি আমরা শহুরে জীবনে কাটিয়ে দিই, তারপরও শহরটা আমার হয়ে উঠেনা। কারন এ শহর আমার নয়। এটি যান্ত্রিক জীবন।

এই যান্ত্রিক শহরে, একই ছাদের নিচে বসবাস কিন্তু কেহ কাউকে চেনেনা বা চেনার প্রয়োজন মনে করেনা। এখানে সবাই রাজা ! কেহ কারও দিকে তাকাবার ফুরসত পায়না। সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত নয় শুধু মহা ব্যস্ত। কেহ জানেনা তার পাশের বাসায় কে বা কারা থাকেন, জানার প্রয়োজন বা কি! ‘কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান’। প্রত্যেকে বুঝে নেয় আমি যদি পচিশ হাজার টাকার ফ্লাটে থাকি নিশ্চয়ই আমার পাশের ফ্লাটে যিনি বা যারা অবস্থান করেন ঠিক উনিও আমার মত বাড়া দিয়ে থাকেন বা আমি যদি ৬০লাখ টাকা দিয়ে ফ্লাট কিনে থাকি আমার পাশের জনও নিশ্চয়ই অত টাকার ফ্লাট কিনে থাকেন বা ভাড়া দিয়ে থাকেন। এখানে সবাই নিজকে দিয়ে অন্যকে মেপে থাকেন। ঠিক যেন কাজী নজরুলের মত ‘ নিজ গুনাহের বাটকারা দিয়ে অন্যের গুনাহ মাপি’ কথাটির মতো। তাই কেহ কারও প্রতি জানার আগ্রহ থাকেনা। অনেক সময় অযাচিত কিছু জানার বা কথোপকতন হয়ে থাকলে কত তটস্থ তাকতে হয়! যদি না আবার কথা বার্তা আচার আচরনে ছোট লোকি বা গেঁয়ো ভাব ফুটে উঠে বা যদিনা আবার ক্ষেত উপাধি প্রাপ্ত হয় ! ইত্যকার কত কিছু মেনে চলে শহুরে জীবন যাপন করতে হয়, যারা অবস্থান করছেন তারাই ভাল জানেন ! ফ্লাটে বা বাসা বাড়িতে চলাফেরায় কত কার্টেসী মেনে চলতে হয়, যদি না পাছে আনকালচ্যারাল ভাবটা ফুটে উঠে ! এরকম মনমানসিকতা হবার পেছনে কারনটাই হচ্ছে পাশা পাশি অবস্থানরত প্রত্যেকেই স্বাবলম্বী-নিজের টাকাপয়সা, আত্মমর্যাদা, বিলাসিতা, সামাজিকতা সবটুকু একান্ত নিজস্ব ব্যাপার! এখানে কারুও ব্যাপারে পাশের অন্য কারও আগ্রহ তেমন নেই বললেই চলে।

শহুরে জীবনেও শ্রেণি বিন্যাস রয়েছে। উচ্চ বিত্তরা সব সময় ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তাঁরা সমাজের উঁচু স্থান সবসময় আগলে রাখেন। তাদের কে আবার এ সমস্ত বিশ্ব মহামারী করোনা বা আম্ফানের মত প্রাকৃতিক দূর্যোগ গুলো তেমন একটা বিচলিত করতে পারেনা। তাঁদের সামাজিক সুরক্ষা ব্যুহ এত মজবুত, এত কঠিন যে, এ সকল প্রাকৃতিক দূর্যোগ সহজে তাঁদেরকে কাবু করতেও তেমন পারেনা। তথাপি করোনা এমন একটা অনুজীব যেটা সমাজের উচুনিচু, ধনী গরীব, কাউকে ছাড়েনি বিধায় কিছুটা ধাক্কা দিতে সক্ষম হলেও অর্থনৈতিক সাপোর্টের কারনে তাঁরা অনেক কিছু সহজে ম্যানেজ করার সক্ষমতা রাখেন। বর্তমান হাসপাতালগুলোর অবস্থা ও পথে পথে বিনা চিকিৎসায় মানুষ মারা যাবার ঘটনাগুলো অনেক কিছু আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আমাদের/সমাজের চোখকে ! আর দেশের আইন কানুন, সুযোগ সুবিধাগুলো তাঁদের (সেসব উপরিওয়ালাদের) রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে যথারীতি ! তা নাইবা বললাম!!

মধ্যবিত্ত-এমন একটা শ্রেণি, যারা সহজেই হার মানতে জানেনা ও রাজী হয়না! ঠিক গ্রামের সেই প্রবাদের মত ‘ভাংগবে কিন্তু মসকাবেনা’। এই শ্রেণিভুক্ত মানুষগুলো খুবই প্র্যাক্টিকেল। তাঁরা সহজে নিজেকে সমর্পণ করতে জানেন না। তাঁরা বিশ্বাস করেন, ‘যতক্ষন শ্বা্স, ততক্ষন আশ’। তাই তারা জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে সাহসের সাথে যুদ্ধ জয়ে কৌশলী হয়ে উঠেন। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারী করোনা কাল দীর্ঘায়িত হওয়ায় প্রেক্ষিতে মধ্যবিত্তের স্বপ্ন সাধ ভেংগে তছনছ হয়ে যেতে বসেছে।এতদিন তাঁরা চোখ বুজে সব সহ্য করেছে। সঞ্চিত সামান্য যে অবলম্বন ছিল সেগুলো ‘অন্ধের যষ্টি’ হিসেবে আগলে ধরে, এই গত মাস ছয়েক-এক মাসের খাবার তিন মাসে খাবার চেষ্টা করে হলেও দিন বদলের অপেক্ষায় থেকেছেন, আশার বুক বাঁধার চেষ্টায় রত থেকেছেন দিনের পর দিন। সদা-সর্বদা আশায় বুক ভাসিয়েছেন, আল্লাহ চাইলে সহসা সুদিন ফিরে আসবে। সুদিনের আশায় থেকে নিজের সামাজিক মর্যাদা অক্ষুন্ন রেখে কার ও কাছে কিছু চাইতে যেমন পারেন নি, তেমনি রাষ্ট্র প্রদত্ত সাময়িক সুযোগ সুবিধাও গ্রহন করেন নি এই ভেবে যে, যাদের একদম চলেনা, যারা দিনে এনে দিনে খেয়ে বাঁচতে পারছেন না-সেই সব দিন মজুর, শ্রমিক, রিক্সা পুলার, বুয়া, হকারসহ যারা প্রতিদিনের উপার্জিত টাকায় পরিবার পরিজন নিয়ে সংসার চালাতো তাদের বাঁচার অবলম্বন অন্তত পাক! প্রায় দু’মাসব্যাপী লক ডাউনে দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষগুলোর কষ্টের সীমা ছিলনা সত্য। তারা না পেরেছে বাইরে এসে কাজ করে পরিবারের মুখে অন্নের সংস্থান করতে, না পেরেছে সরকারি সাহায্য গ্রহন করতে। কারন এই করোনা কালে চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারীর সংখ্যা পুর্বের চেয়ে বহু গুন বৃদ্ধি পেয়েছে। সদ্য দারিদ্র্য সীমার নিচে চলে যাওয়া লোকের ভীড়ে পুর্বের দারিদ্র্য মানুষগুলো রীতিমত প্রতিযোগিতার সম্মূখীন হয়েছে। মোট কথা ঘরে যাদের খাবার নেই, ক্ষুধা নিবারনের উপকরন নেই আবার অনেকেই লক ডাউনের কারনে ব্যাংকে টাকা আছে হাতে নেই এ অবস্থায় মানুষকে কালাতিপাত করতে হয়েছে!

বলছিলাম কি, সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির কথা, যারা কোন দিকে ভীড়াতে পারছেন না তাদের জীবন তরীকে! তাঁরা পড়ে গেছেন এখন মহা সমাস্যায়। এই মরণব্যাধি করোনায় মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ভেংগে তছনছ করে দিয়েছে, তারা এখন কেহ মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে নেই! তাঁরা এখন নিম্ন মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত শ্রেণিতে নেমে গেছেন। করোনা মধ্যবিত্তকে শ্রেণির বিভাজনসহ উপড়ে ফেলেছে বলে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির মতে “করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় লকডাউনের ৬৬ দিনে বাংলাদেশের প্রায় ৬ কোটি মানুষ নতুন করে গরিব হয়েছে” গত ৮ জুন-২০২০ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের জন্য বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপনকালে সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত এই দাবি করেন। তিনি আরও বলেন, ২৬ মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির সময়টাতে লকডাউন হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছে অর্থনীতি সমিতি। তাদের দাবি, বাংলাদেশ এখন ‘উচ্চ আয় বৈষম্য’ এবং ‘বিপজ্জনক আয় বৈষ্যমের’ দেশে পরিণত হয়েছে।

আবুল বারকাত বলেন, ‘কোভিড-১৯ এর কারণে দ্ররিদ্র মানুষের বেহাল অবস্থা। লকডাউনের ৬৬ দিনে নবদরিদ্র ও অতি দরিদ্র সৃষ্টি হয়েছে ৫ কোটি ৯৫ লাখ বা প্রায় ছয় কোটি। শ্রেণি কাঠামোর ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। তবে অতি ধনী শ্রেণির ওপর এর কোনও প্রভাব পড়েনি।’
তিনি দাবি করেন, লকডাউনে অতি ধনী শ্রেণির ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষের আর্থিক অবস্থায় কোনও পরিবর্তন হয়নি, বরং কোনও ধনী আরও ধনী হয়েছে। তবে আগের ৩ কোটি ৪০ লাখ উচ্চ মধ্যবিত্ত থেকে মধ্য মধ্যবিত্ত হয়েছে ১ কোটি ১৯ লাখ, ৩ কোটি ৪০ লাখ মধ্যম পর্যায়ের মধ্যবিত্ত থেকে ১ কোটি ২ লাখ হয়েছে নিম্ন মধ্যবিত্ত, ৫ কোটি ১০ লাখ নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে ১ কোটি ১৯ লাখ দরিদ্র এবং ৩ কোটি ৪০ লাখ দরিদ্র থেকে ২ কোটি ৫৫ লাখ অতি দরিদ্র হয়েছে। ৬৬ দিনে সব মিলিয়ে ৫ কোটি ৯৫ লাখ নতুন করে দরিদ্র ও অতি দরিদ্র হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত উল্লেখ করেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ব এখন মহা বিপর্যায়কাল অতিক্রম করছে। ২১৩টি রাষ্ট্র ও ৮০০ কোটি মানুষ আজ মহাসংকটে। এ ভাইরাসের কারণে অর্থনীতির হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ ৭ জুন পর্যন্ত ৮ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। আইএলও’র হিসাবে বিশ্বের ৫০ ভাগ মানুষ জীবিকা হারাবেন। বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষও একই পথের পথিক’।

স্বপ্নের শহরে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা এখন আর ঠিকে থাকার স্বপ্নে বিভোর থাকছেন না। তাঁরা এখন বুঝতে পেরেছেন তিলে তিলে গড়ে উঠা ইট কংকরের শহুরে পরিবেশে তাঁদের বসবাসের সুযোগ সীমিত হয়ে এসেছে। তাঁরা ইচ্ছে করলেও আর যান্ত্রিক শহরে বসবাস করতে কোনভাবেই সক্ষম নয়। তাঁরা অনুমান করতে পেরেছেন বৈশ্বিক করোনা তাদের জীবনে যে বিপর্যয় নিয়ে এসেছে তা অভাবনীয় এবং কোনভাবেই আর পুর্বের অবস্থায় ফিরে যাবার সুযোগ নেই। তাঁরা এখন দীর্ঘকালে তিলে তিলে গড়ে তোলা সংসার মধ্যরাতে, সকালে অথবা দুপুরের কোন এক সময়ে, তুলে দিচ্ছেন পিকআপ নামক চার/ছয় চাকার যান্ত্রিক যানে। যে যান শহুরে জীবনে চাকচিক্য, মরীচিকার স্বপ্নকে ধুয়ে মুছে ও অযাচিত কল্পনার ঘোড়াকে পেছনে ফেলে, ফিরে যাচ্ছেন সেই চিরচেনা গ্রামে, যে গ্রামের মাটি ও কাঁদার গন্ধ আষ্টে পীষ্টে এখনো লেগে আছে তাঁর সারা শরীরে ! অনেকদিন আগে যে গ্রাম ছেড়ে এসেছিলেন, সেই গ্রামেই চলে যেতে হচ্ছে তাঁকে। এখন কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে, সেই গ্রামেও কি তাঁরা শান্তির সুবাতাস পাবেন, নাকি অপেক্ষা করছে একরাশ হতাশা ও অনিশ্চয়তা? সময়েই বলে দেবে ইতিহাসের বাকী ইপিসোড কিভাবে রচিত হবে!

শহুর জীবনের যান্ত্রিকতা থেকে একদল ফিরে গেছেন গ্রামে, তার ফেলে আসা স্বপ্নের বাড়িতে। বাকিরা লড়ছেন এখনো এই শহরে। স্রেফ টিকে থাকার সংগ্রাম। আবার কার ভাগ্যে এই যন্ত্রনা এসে পড়বে সেটি সময়ই বলে দেবে! জিডিপি, ঊর্ধ্বমুখী ইমারত, বড় বড় ওভারব্রিজ, মেট্রোরেল যে জীবনমানের প্রকৃত নির্দেশক নয় তা এখন আরো খোলাসা হয়ে গেছে। ভোগবাদী এই সমাজে মধ্যবিত্ত প্রায় সবসময়ই বিপদে ছিল। তাদের টিকে থাকাই ছিল কঠিন। জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে সেভাবে তাদের মানিব্যাগ বড় হয়নি। পরিবারের সদস্যদের চাওয়া পাওয়ার অনেক কিছুই পূরণ হয়নি। যদিও তাদের কেউ কেউ নাম লিখিয়েছেন উচ্চবিত্তের খাতায়। কেউবা এমন জীবনে অভ্যস্ত হয়েছেন যার জোগান এখন আর দিতে পারছেন না। যে স্বল্প সংখ্যক বিত্তের চূড়ায় উঠেছেন, বেগমপাড়ায় ঘরবাড়ি করেছেন তাদের কথা আলাদা। কিন্তু চিরকালীন যে মধ্যবিত্তের জীবনটা সবসময়ই কঠিন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের দেয়া এক হিসাবমতে, বাংলাদেশে ১৬ কোটি মানুষের চার কোটি পরিবার রয়েছে। এরমধ্যে নিম্নবিত্ত ২০ ভাগ আর উচ্চবিত্ত ২০ ভাগ। মাঝের যে ৬০ ভাগ এরা নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ মধ্যবিত্ত। এই সংখ্যা আড়াই কোটি পরিবার হবে।

পরিস্থিতি যে এতটা কঠিন হবে তা অবশ্য শুরুর দিকে আঁচ করা যায়নি। মার্চের শেষ সপ্তায় সাধারণ ছুটি বা লকডাউন শুরুর পর সবচেয়ে বিপর্যয়ে পড়ে নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ। তাদের বেশির ভাগই নিজেদের জীবিকা হারিয়ে ফেলেন। অনেকে শহর ছেড়ে চলে যান। এসব নিম্ন আয়ের মানুষের পাশে দাঁড়াতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ দেখা যায়। মধ্যবিত্তের ওপর আঘাতটা আসে আরেকটু পরে। সঞ্চয় ভেঙে খাওয়া শেষে তারা দেখেন হাতে কিছুই নেই। পরিবর্তিত সময়ে তারা সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়ছেন বাসা ভাড়া মেটাতে গিয়ে। এমনিতে তাদের টালি খাতার হিসাব মেনে চলতে হয়। যা বেতন পান দেখা যায় তার অর্ধেক চলে যায় বাসা ভাড়া মেটাতে। বাকি অর্ধেকে টেনেটুনে চলেন। কিন্তু এমন মধ্যবিত্তের অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। তাদের জন্য এই শহরে টেকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বেতন আটকে গেছে অনেক প্রতিষ্ঠানে। কেউবা দু’মাসে একবার বেতন পেয়েছেন। বেতন কমে গেছে অনেকের। এমনকি কয়েকটি ব্যাংকও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কমিয়েছে। অথচ গত কয়েক বছর ধরে ব্যাংকের চাকরিকে অন্যতম আকর্ষণীয় হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বলা হচ্ছে, সরকারি চাকরিজীবী ছাড়া কেউই আসলে ভালো নেই।

করোনাভাইরাস শুধু সংক্রমণ ও মৃত্যু ঘটাচ্ছে না, জীবনমৃত অবস্থায় ফেলে দিয়েছে অনেককেই! এই করোনা আমূল পাল্টে দিচ্ছে মানুষের জীবন, জীবিকা ও বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন টুকুও। করোনা উপস্থিতি যতই দীর্ঘায়িত হচ্ছে, মানুষের অভাব অনটন ততই বাড়ছে। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, ‘করোনায় মানুষের মৃতের হার গানিতিক হারে, কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষতি জ্যামিতিক হারে’। এই অর্থনীতির ক্ষতি সারা বিশ্বে মারাত্মক আকার ধারন করেছে। যদি এমন হতো, এক এলাকায় বা কিছু দেশে এই করোনা দেখা দিয়েছে, অন্য দেশগুলো অর্থনৈতিক ক্ষয় ক্ষতি থেকে মুক্ত। তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে চলমান বিপর্যয় হয়ত এরুপ জটিল আকার ধারন করতনা! সামনে কি কঠিন অর্থনৈতিক বিপর্যয় অপেক্ষা করছে আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কেহ জানেন না। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মানুষগুলো পড়েছে সবচেয়ে বড় গ্যাঁড়াকলে। নিম্নমধ্যবিত্তদের ছোটখাটো চাকরি করলে সেটা চলে গেছে, ব্যবসা থাকলে সেটাও বন্ধ। শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যাবেন, কিন্তু বকেয়া বাড়িভাড়া ও মুদি দোকানের বিল পরিশোধ করার তাগাদা। অবশেষে অনন্যোপায় হয়ে ঘরের আসবাপত্র বিক্রি করে তবেই বকেয়া পরিশোধ করছেন অনেকে।

আবার মধ্যবিত্তের আয় রোজগারের দু’তৃতীয়াংশ চলে যায় বাসা ভাড়া ও হালকা শৌখিনতামুলক কাজে। তাঁরা জীবনটাকে উপভোগ করতে গিয়ে সঞ্চয়ের দিকে নজর দেবার ফুরসত পায়নি। তাঁরা চিন্তা করেছে এই তো বেশ চলছে-কারো থেকে আনতে হচ্ছে না, কাকেও তেমন দিতে হচ্ছেনা। যতই আয় করা হয় নিজের ও পরিবারের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ব্যয় করতে কুন্ঠা বোধ করেন না। তাদের সঞ্চয়ের দিকে তেমন মনযোগ ছিলনা! কিন্তু বৈশ্বিক মহামারী করোনা এভাবে সব কিছু ওল্টপাল্ট করে দিবে তাঁরা ঘুনাক্ষরেও চিন্তা করনেনি। এই মহামারীতে সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন সেই মধ্যবিত্ত সমাজ ! তাঁদের এখন আয় রোজগারের সেই অবস্থা নেই। যে আলিশান বাসা বাড়িতে অবস্থান করতেন, বাস্তবতার কারনে সেই বাসায় অবস্থান করা তাঁদের পক্ষে এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এখন হয় তাঁকে অপেক্ষাকৃত কম দামের বাসা ভাড়ায় যেতে হচ্ছে না হয় পরিবারকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। তাই চট্রগ্রাম শহরের অনেক আবাসিক এলাকায় বাসা ছাড়ার ধুম পড়েছে। সব খানে টু লেট সম্বলিত নেমপ্লেট ঝুলানো! আমার বাসা চট্রগ্রামের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় হওয়ায় বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রিক মিডিয়ায় প্রচারিত খবরে সত্যতা যাছাই করার জন্য আমি চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা/সুগন্ধা আবাসিক এলাকা/হিলভিউ আবাসিক এলাকা/মির্জারপুল আবাসিক এলাকা/কল্পলোক আবাসিক এলাকার প্রতিটি রোড ঘুরে ঐসব খবরের সত্যতা পেয়েছি। আরও একটা জিনিস উপলব্ধি করতে পারলাম যে, এমন কোন বিল্ডিং নেই যেখানে টু লেট নেমপ্লেট ঝুলানো নেই! প্রায় প্রতিটি বিল্ডিং এ টু লেট ঝুলানো আছে। মাত্র গত মাস পাঁচেক হচ্ছে আমার এক কাছের রিলেটিভের জন্য বাসা খুঁজছিলাম এই চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায়। কিন্তু খুব কষ্ট করে মাত্র হাতে গুনা কয়েক জাগায় টু লেট নেমপ্লেট ঝুলানো দেখতে পেয়েছিলাম কিন্ত এখন প্রায় প্রতিটি বিল্ডিং এ টু লেট নেমপ্লেট ঝুলানো থেকেই বুঝতে পারলাম আসলেই অনেক মানুষ এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন অথবা আরও কম দামের বাসা নিয়ে অন্য এলাকায় চলে গেছেন।

করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি আজ যেখানে অবরুদ্ধ, সেখানে ধেয়ে আসছে মহামন্দা। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই মহামন্দার মাত্রা ১৯২০ সালের মহামন্দার চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। বিশ্বের বড় বড় এবং শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোর সরকার প্রধানদের কপালে দুশ্চিন্তার কালো ছাপ স্পষ্ট। এটা যতটা কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যার এবং এর ফলে মৃত্যুহারের ঊর্ধমুখির জন্য, ঠিক ততটাই অর্থনীতিতে মহামন্দার আশঙ্কা নিয়ে। দুশ্চিন্তা বাংলাদেশের মতো মধ্য আয়ের অর্থনীতির জন্যও কম নয়; বরং বহুমুখি। করোনা মোকাবেলার প্রচলিত লকডাউন থিসিস অনুসরণ করার ফলে বলা চলে কৃষি উৎপাদন ছাড়া পুরো অর্থনীতি আজ অবরুদ্ধ। এর ফলে একদিকে যেমন অর্থনীতিতে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া কয়েক কোটি মানুষের আহারের চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এই করোনা কালে সবচেয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন নিম্ন আয়ের লোকজন ও সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণি! তাঁরা আজ সীমাহীন কষ্টের মধ্যে কালাতিপাত করছেন। মধ্যবিত্তরা এখন একধাপ বা দুই ধাপ নিচে নেমে নিম্ন মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণিতে পরিনত হয়েছে। আবার নিম্নবিত্তরা দারিদ্র্যসীমার লাইন অতিক্রম করে নিচে নেমে অতি দারিদ্র্য হিসেবে পরিগনিত হয়েছে। এই দুই শ্রেণি তাদের আত্মমর্যাদার কারনে কারো কাছে হাত পাততে পারেন না। তাই ধুঁকে ধুঁকে কষ্ট পেয়ে জীবন জীবিকার জন্য স্থানচ্যুত হয়ে গ্রামে গঞ্জে চলে যেতে ও দ্বিধা করেন না। তাই আজকাল শহরে বাসা বাড়ি ছেড়ে দেবার হিড়িক পড়েছে। এই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা শহুরে জীবনের অধ্যায় শেষ করে ভাগ্যের অন্বেষনে গ্রামের দিকে পা বাড়িয়ে দিয়েছেন। এই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের চাপা কান্না দেখার যেন কেহ নেই। ধন্যবাদ। তারিখঃ ২৩-শে জুন-২০২০।

লেখকঃ প্রেসিডেন্ট-বিএমএসএফ,উখিয়া উপজেলা শাখা ও ভাইস প্রেসিডেন্ট-উপজেলা প্রেসক্লাব উখিয়া।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর....