• বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারী ২০২২, ০২:৩৪ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঘন ঘন অগ্নিকান্ড-এটা কি নিছক দূর্ঘটনা নাকি কোন পরিকল্পিত ‘স্যাবোটাজ’!

AnonymousFox_bwo / ৩৮ মিনিট
আপডেট শুক্রবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২২

প্রথম পর্ব

এম আর আয়াজ রবি, উখিয়া কক্সবাজার।

গত ০৯-জানুয়ারী-২০২২ তারিখে, কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালীর শফিউল্লাহ কাটা নামক রোহিঙ্গা ক্যাম্প১৬ এ, অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৬ শতাধিক ঘর পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। এর মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনধিক ১৫টি ঘরও রয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এছাড়াও আগুন নেভাতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও দেড় শতাধিক ঘর আংশিক কিংবা পুর্ণাঙ্গভাবে। সবকিছু হারিয়ে, প্রচন্ড শীতে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে আড়াই হাজারের অধিক রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জন গোষ্টি। একে তো প্রচণ্ড শীত, তার ওপর বসতি হারিয়ে চরম কষ্টে পড়েছে এসব বাস্তুহারা মানুষগুলো। তবে দ্রুত রোহিঙ্গাদের শেল্টার নির্মাণ করে দেওয়াসহ সমস্যা লাঘবে কাজ করছে বলে জানিয়েছে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (RRRC) শাহ রেজওয়ান হায়াত।

আইওএম’র ন্যাশনাল কমিউনিকেশন অফিসার তারেক মাহমুদ বলেন, কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা নিরীক্ষা করা হচ্ছে। তা ঠিক করার পর সমন্বয় করে দ্রুত সমস্যার সমাধান করা হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শামছুদ্দৌজা জানান, ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ইউএনএইচসিআর-এর পক্ষ থেকে দেয়া হচ্ছে তাঁবু। রাতের আশ্রয় তৈরির কাজ করছে ক্ষতিগ্রস্ত অনেকে।
উল্লেখ্য, রোববার সন্ধ্যার আগে ৫টার দিকে ৮ এপিবিএন’র আওতাধীন রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১৬ শফিউল্লাহ কাটা বি, সি ব্লকে আগুন লাগে। মুহূর্তে আগুনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়ে আগুনে পুড়ে প্রায় ৬০০টি শেড। আগুন লাগার খবর পেয়ে এপিবিএন’র কন্ট্রোলরুম থেকে উখিয়া-টেকনাফ এবং কক্সবাজারের ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ১৪ এপিবিএন অধিনায়ক মো. নাইমুল হক অর্ধশত অফিসার ও ফোর্সসহ ঘটনাস্থলে এসে আগুন নেভানোতে সহায়তা করেন।
সাথে এপিবিএন-৮ এর চৌকষ জোয়ানরা অগ্নি নির্বাপণে যোগ দিয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে রাতে ও সকালে বিভিন্ন এনজিও সংস্থা প্রয়োজনীয় খাবার সামগ্রী বিতরণ করেছে। ভুক্তভোগী রোহিঙ্গারা ক্যাম্প: ১৬-এর অন্তর্ভুক্ত সকল লার্নিং সেন্টার, মাদ্রাসা/মক্তব, ওমেন ফ্রেন্ডলি স্পেস, আত্মীয়-স্বজন ও পার্শ্ববর্তী ক্যাম্পে আশ্রয় নেন। অনেকেই আশে পাশে ক্যাম্পে আত্মীয় স্বজনদের শেডে গিয়ে আশ্রয় নিতেও দেখা গেছে। ।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্ত ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন। অতিরিক্ত প্রত্যাবাসন কমিশনারকে প্রধান করে গঠন করা কমিটিতে ৮ এবিপিএন, ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা ও সিআইসিকে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পর ক্ষতিগ্রস্ত বসতি ও ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ জানানো হবে বলে উল্লেখ করেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, আগুন লাগার পর খুব কষ্ট করে, কাঁটা তারের বেড়া কেটে, এক কাপড়ে কোনো রকম পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপদ আশ্রয় গিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছেন ভোক্তভোগীরা। বসতি ছাই হওয়ার পাশাপাশি, তাদের পুড়ে গেছে মুল্যবান কাপড়-চোপড়, আসবাবপত্র কিংবা খাদ্যসামগ্রী। পরের দিন সকাল না হতেই পুড়ে অঙ্গার হওয়া বসতি পর্যবেক্ষণে রোহিঙ্গা ও স্থানীয়রা তাদের বসতিতে খুঁজে বেড়াচ্ছেন অবশিষ্ট কিছু পাওয়া যায় কিনা। অনেকের চোখের নোনা জলে ভাসাচ্ছেন বুক, অনেকে গগন বিদারী আর্তনাদ আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে তুলছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো আগুনে কেড়ে নিয়েছে তাদের সব সহায় সম্বল, ঘর-বাড়ি, আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় মুল্যবান সামগ্রী। শুধু নীরব স্বাক্ষী হিসেবে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে তাদের বসতির আরসিসি পিলারগুলো।
গত ২-জানুয়ারী-২২ তারিখে ক্যাম্প ২০ এক্সটেনশনেও আগুনের ঘটনা ঘটে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আবারো আগুন সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে। গত বছরের ২২-শে মার্চ বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে আগুনে পুড়ে গিয়েছিল, শতশত শেড, ঘরবাড়ি, মহামুল্যবান সামগ্রী পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। সূত্র জানায়, গত এক বছরে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় ০৮টি মত আগুনের ঘটনা ঘটে কিন্তু ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটে উল্লেখিত তিনটি। গত বছরের ২২শে মার্চ রাতে উখিয়ার ৮ ও ৯ নম্বর ক্যাম্পে ভয়াবহ আগুনে বহু বসতি পুড়ে যায় এবং ১১ জন নিহত হয়েছিল। উক্ত আগুনের ঘটনায় উখিয়া উপজেলার বালুখালী ৮ নম্বর রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের আগুন রাত পৌনে ১০টার দিকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, এ ঘটনায় ৯ হাজার ৬০০ ঘর পুড়ে গেছে। তবে তাৎক্ষণিক হতাহতের কোনো তথ্য পাওয়া না গেলেও, পরে ১১ জন নিহত হবার খবর পাওয়া গিয়েছিল। শিবিরের একটি ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল, সঙ্গে সঙ্গে আশপাশে ছড়িয়ে পড়লে একের পর এক রোহিঙ্গা বসতি পুড়ে যায়। রাত পৌনে ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্নভাবে আগুন জ্বলছিল। আগুনের সূত্রপাত গ্যাস সিলিন্ডার থেকে হয়েছিল বলে জানা গিয়েছিল।
গত ২রা জানুয়ারি-২২ উখিয়ার বালুখালী ২০ নম্বর ক্যাম্পে জাতিসংঘের অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা (আইওএম) পরিচালিত করোনা হাসপাতালে আগুন লাগে। এতে কেউ হতাহত না হলেও হাসপাতালের আইসোলেশন সেন্টারের ১৬টি কেবিন পুড়ে যায়।

ঘন ঘন ক্যাম্পে আগুন, জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার উদ্ভব হচ্ছে। এই আগুনের ঘটনা নিছক দূর্ঘটনা? নাকি অন্য কোন কারণ? নাকি কোন গোষ্ঠীমহলের পরিকল্পিত স্যাবোটাজ? জাতি ও দেশের স্বার্থে প্রশ্নটি আজ খুবই বড় হয়ে আছে। অগ্নি কান্ডের ঘটনা ‘নিছক দূর্ঘটনা নাকি স্যাবোটাজ’ এটা বের করা সাংবাদিকদের যেমন কাজ, তেমনি রাষ্ট্রীয় আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার নিরপেক্ষ তদন্ত ও গবেষনারও প্রয়োজন রয়েছে বলে আমি মনে করি। অগ্নিকান্ড সংঘটিত হবার পেছনে বিভিন্ন তথ্য, উপাত্ত, মোটিভ সংগ্রহ করে রীতিমতো গবেষনার প্রয়োজন রয়েছে। উক্ত গবেষণার অথেন্টিক প্রতিবেদন দাখিল করার প্রয়োজনও রয়েছে।
কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে বা স্থানীয় সচেতন মহলের মতামতের মধ্যে বরাবরই আগুন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া বিদ্যমান রয়েছে। শফিউল্লা কাটার জনৈক ইব্রাহিম অত্র প্রতিবেদককে বলেন, ” রোইগ-গারা টীন সেডত আর থাই ত ন চা র, ইতারা এই অবস্থার উন্নয়ন চা-র, ইতারা চাদ্দে নোয়াহালীর হাতিয়ার ভাসন চরর ডেইক্কা ঘর বাড়ি, থাইবার জাইগা উখিয়া টেকনাফতও, চা-র। ইতারার ইন্ডিল্লা চাইবার হারনে হামিশা গর পুড়ার ঘটনা চলের ” (‘রোহিঙ্গারা ঝুপড়ি ঘরে আর অবস্থান করতে চাচ্ছে না, তারা এ অবস্থার উন্নতি কামনা করছে। তারা নোয়াখালীর হাতিয়ার ভাসানচরের আদলে এখানেও অর্থাৎ উখিয়া টেকনাফেও পাকা শেড, পাকা বাড়ি নির্মানের প্রত্যাশা করছেন। তারই অব্যক্ত আশাবাদ থেকে থেমে থেমে নিজেরাই আগুনের ঘটনা ঘটিয়ে চলছে’)।
জনৈক রোহিঙ্গা যুবক আবুল শামা বলেন, আইএনজিও, এনজিও সাব অক্কল প্রজট ফুরাই গেইলই নুয়া প্রজট পাইবল্লায় আরার রূইজ্ঞা মইসন লই আত মিলাই অইন জ্বালাই দেগই। অইন জালাই ইতারা নুয়া প্রজট পা-য়,ইতারার চ রি থাহে (‘বিভিন্ন আইএনজিও, এনজিও কর্মকর্তারা তাদের নির্ধারিত প্রজেক্ট শেষ হবার অব্যবহিত পূর্বে তাদের (রোহিঙ্গাদের) সহায়তায় বিভিন্ন ক্যাম্পে আগুনের ঘটনা ঘটাচ্ছে। কারণ আগুনের অজুহাতে তারা নতুন প্রজেক্ট পায়, তাদের চাকুরী হারাতে হয় না’।
আবার ক্যাম্প-১৬ এর শামশু বলেন, ” রুইজ্ঞা অক্কল নিজেরা নিজেরা এলাহা দহল লইবার লায়, নিজেরা নিজেরা মাইরপিট গরে। ক্যাম্পর ভিতরত কি অই যার গই তোয়ারা হইত পারন্নে? এড়ে রাতিয়া রুইজ্ঞা অক্কলর দহল থাহে।লাল গুটি, নেশা, মত, ইনরলাই ইতারা ইতারা মারামারি গরে। এক পক্ক অন্য পক্করে লাগাই দিবল্লাই, নিজেরা নিজেরা আহাম কুহাম গরিওরে ঐতারারে লাগাই দেয়। বেইক্কনর সুজা হাম অইলদে গর জ্বালাই দন (‘রোহিঙ্গাদের মধ্যে ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিভিন্ন সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে ব্যবসা, মাদক, ইয়াবা বা অন্যান্য ব্যাপারে বিরোধ সৃষ্টি হলে, সেই বিরোধের অবসানকল্পে নিজেদের মধ্যে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, দাঙ্গা হাঙ্গামা, খুনাখুনী ঘটনা সংঘটিত করে এবং সহজ উপায় হিসেবে একে অন্যের শেডে আগুন লাগিয়ে অথবা নিজেরা নিজেদের শেডে আগুন লাগিয়ে অন্যদের ঘায়েল করার কু-মতলবও থেকেও আগুনের সুত্রপাত হতে পারে’)।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বার বার আগুনের ঘটনা আসলে কিসের আলামত? রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এত এত দেশি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার অবস্থান। বিশেষ করে আমাদের দেশীয় গোয়েন্দা সংস্থাসমুহের নক দর্পনে অন্তরালের সব ঘটনা জানা থাকার কথা।গোয়েন্দা সংস্থাসমুহ পুর্ব সতর্কতামূলক কোন সাবধান বাণী ঘোষণা করেন কিনা আমাদের জানা নেই। অনেকের মতে গোয়েন্দা সংস্থার কার্যকলাপ স্পষ্ট হওয়া উচিত। (হয়ত স্পষ্ট, কিন্তু আমাদের অবধি হয়ত আসে না!) রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতিটি অপ্রীতিকর ঘটনার বিপরীতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে জবাবদিহীতা চাওয়া হয় নিশ্চয়ই। আর আমাদের আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী, সেনা বাহিনী, বিজিবির সদস্যরা, এপিবিএনসহ অন্যান্য বাহিনী নিশ্চয়ই সন্তোষজনক কাজ করে যাচ্ছেন। রোহিঙ্গা বিষয় এখন শুধু রাষ্ট্রীয় বিষয় নয়, এটি এখন আন্তর্জাতিক বিষয়।
(চলবে…।)

লেখকঃ প্রেসিডেন্ট -বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক ফোরাম ( BNJF) উখিয়া উপজেলা শাখা ও ভাইস প্রেসিডেন্ট- উপজেলা প্রেসক্লাব উখিয়া।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর....