• রবিবার, ০২ অক্টোবর ২০২২, ০৭:৫৭ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
এ বছরে নোবেল প্রাইজের জন্য মনোনীত বাংলাদেশী চিকিৎসক রায়ান সাদী কক্সবাজারে ৪২ কোটি টাকায় বনায়ন, নতুন রূপে সাজবে হিমছড়িসহ কক্সবাজার জেলা। পুলিশের প্রশিক্ষণ খাতে এনজিওগুলো শত শত কোটি টাকা অনুদান পেয়েছে : বেনজীর আহমেদ  রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গত রাতেও ০১ জন খুন, অস্থিতিশীল অবস্থায় স্থানীয়রাও চরম আতংকে। র‍্যাব-৭ কর্তৃক ২ লক্ষ ৩৮ হাজার ইয়াবাসহ ০৩ জন আটক। র‍্যাব-৭ কর্তৃক ২ লক্ষ ৩৮ হাজার ইয়াবাসহ ০৩ জন আটক। উদ্ধারকৃত ইয়াবার আনুমানিক মুল্য ৬ কোটি। উখিয়া রেঞ্জকর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে উদ্ধারকরা ৩ শতাধিক বক অবমুক্ত করা হয় উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এক রোহিঙ্গা ভলান্টেয়ারকে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নির্মমভাবে খুন। ঘুংধুম সীমান্তে চরম উত্তেজনায় এসএসসি ও সমমানের পরিক্ষার কেন্দ্র পরিবর্তন শাড়ি পরে কলেজে গেল ছেলে, ছবি পোস্ট করলেন ‘গর্বিত’ বাবা!

ধনীর ভান্ডার ভরপুর হলেই দেশের উন্নয়ন হয় না

AnonymousFox_bwo / ১২৭ মিনিট
আপডেট সোমবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২২

আইকন নিউজ ডেস্কঃ

বর্তমান সরকারের উন্নয়নের গণতন্ত্রের হাত ধরে জিডিপির হার বেড়েছে, প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে। একই সঙ্গে ধনী লোকের সংখ্যাও বেড়েছে সমহারে।

এ কে এম শামসুদ্দিন
সম্পদের প্রতি লোভ কার না আছে! এই লোভ মানুষের সহজাত স্বভাব। এই ভূমণ্ডলে খুব কম মানুষই পাওয়া যাবে যিনি সম্পদশালী হতে চান না। এ কথা অনস্বীকার্য যে সম্পদ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিধান করে। আমরা সবাই একটি সচ্ছল জীবন চাই। এই সচ্ছল জীবনের জন্যই সম্পদের প্রয়োজন আছে। প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারণ করা সম্ভব নয়। কাজেই সম্পদ বা অর্থের চাহিদা মানুষের চিরকালের। তবে এই চাহিদার রকমফের আছে। কেউ অধিক সম্পদশালী হতে চায়; কেউ আবার সচ্ছল জীবনের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সম্পদ পেলেই খুশি।
তারপরও মানুষের অধিক সম্পদ অর্জনে চেষ্টার শেষ নেই। কে কত বেশি সম্পদের অধিকারী তার ওপর নির্ভর করে কে কত বড় ধনী ব্যক্তি। আমাদের সমাজে একশ্রেণির মানুষ আছে, যাঁরা বরাবরই অতিরিক্ত সম্পদের মালিক হতে চান, সেই সম্পদ যে পথেই আসুক না কেন। ইদানীং আমাদের সমাজে অতিদ্রুত ধনী হওয়ার এক অসুস্থ প্রবণতা দেখতে পাই। এরূপ প্রবণতা নিঃসন্দেহে ভালো নয়। দ্রুত ধনী হওয়ার এই প্রবণতা সমাজে বৈষম্যের সৃষ্টি করছে। অর্থাৎ ধনী-গরিবের ব্যবধান বৃদ্ধি করছে। এ বিষয়ে গত বছরের একটি পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যাবে। গত বছর দেশে শীর্ষ ১০ শতাংশ ধনীর আয় মোট জাতীয় আয়ের ৪৪ শতাংশ ছিল। একই সময়ে দেশের শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী মানুষের আয় ছিল ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ। অপরদিকে সমাজে পিছিয়ে পড়া ৫০ শতাংশ মানুষের আয় শীর্ষ ১ শতাংশ মানুষের চেয়ে অতি সামান্য বেশি, অর্থাৎ ১৭ দশমিক ১ শতাংশ ছিল।
এর অর্থ কী দাঁড়াল? শীর্ষ আয়ের মানুষের সঙ্গে নিম্ন আয়ের মানুষের আয়ের অনেক বেশি ব্যবধান! ওপরের ধনী-গরিবের আয়ের ব্যবধান বিবেচনায় নিলে আমাদের দেশে মাথাপিছু আয়ের প্রকৃত চিত্রটি ফুটে উঠবে। অর্থাৎ বাংলাদেশে এ বছর গড় মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৫৫৪ ডলার বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তার পেছনের শুভংকরের ফাঁকিটা ভালোভাবেই বোঝা যাবে। আমাদের দেশের মাথাপিছু যা আয় দেখানো হচ্ছে, তাতে নিম্ন আয়ের মানুষের আয়ের সঠিক চিত্রটি প্রতিফলিত হয় না। আমাদের দেশে আড়াই হাজার ডলারেরও বেশি আয়ই যদি মানুষের হতো, তাহলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই দুঃসময়ে টিসিবির ট্রাকের পেছনে সমাজের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের এমন লম্বা লাইন দেখা যেত না।
আমার আজকের বিষয়বস্তু নাগরিকের গড় আয়ের হিসাবের গরমিল শুধু খুঁজে বের করা নয়। এর সঙ্গে ক্ষমতার বলয়ে থাকা একশ্রেণির মানুষ কীভাবে প্রচুর সম্পদশালী হয়ে সমাজে বৈষম্যের সৃষ্টি করছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করা। যদিও আমি অর্থনীতির ছাত্র নই; তবু এ দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে গরিবের অর্থ-সম্পদ হরণ করে কিছু মানুষ কীভাবে ধনী থেকে অধিক ধনী হয়ে উঠছেন, তা বোঝার ন্যূনতম ধারণা আছে বলে মনে করি। আমার বিশ্বাস, এ দেশের সচেতন নাগরিক মাত্র সবাই এই সামান্য জ্ঞানটুকু রাখেন এবং গরিবের অর্থসম্পদ লুণ্ঠনকারী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের প্রকৃত চেহারা ভালো করেই চেনেন। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, ঋণ জালিয়াতি, ব্যাংক লুটপাট এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার মতো ঘটনা সম্পর্কে সচেতন নাগরিকেরা খোঁজখবর রাখেন। শুধু তা-ই নয়, নিজেদের বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার সক্ষমতাও রাখেন।

আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি যে কৌশলে মুছে ফেলা হচ্ছে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ। গত চার বছরের আর্থিক প্রতিবেদন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ঋণ পরিশোধে ছাড়, সুদ মওকুফসহ খেলাপিদের নানা সুবিধা দিয়েও লাগাম টেনে ধরতে পারছে না ঋণ পরিশোধ না করার প্রবণতা। অতঃপর খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে ঢালাও সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ আড়াল করতে ব্যাংকগুলো ‘ঋণ অবলোপন’ বা ‘রাইট অফ’-এর কৌশল বেছে নিয়েছে। একই সঙ্গে গণহারে খেলাপি ঋণের সুদও মওকুফ করছে ব্যাংকগুলো। গত চার বছরে অবলোপনের মাধ্যমে ৯ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আর্থিক প্রতিবেদন থেকে বাদ দিয়েছে ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে ২০২১ সালে অবলোপনের মাধ্যমে ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট থেকে ২ হাজার ৪৪১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বাদ দেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালে অবলোপন করা হয়েছিল ৯৭১ কোটি টাকা। এর আগের বছর কাগজে-কলমে অবলোপন করা হয়েছে ২ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে এর পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি, ৩ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা।

প্রশ্ন হচ্ছে, যে হাজার হাজার কোটি টাকা ‘রাইট অফ’ করে দেওয়া হচ্ছে, এগুলো কার টাকা? শুধু ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট ঠিক রাখার জন্য যদি ‘রাইট অফ’ করা হয়ে থাকে তাহলে ভিন্ন কথা। তাতে অন্তত এটা বোঝা যাবে যে ঋণের টাকা আদায়যোগ্য। আর যদি ঋণ আদায় না করে শুধু ‘রাইট অফ’ করার কৌশল বেছে নেওয়া হয়, তাহলে খেলাপিরা উৎসাহিত হবে। খেলাপিদের ঋণ পরিশোধ না করার প্রবণতাও বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন বলেছেন, ব্যাংকের ব্যালেন্সশিট ভালো রাখতে ব্যাংকগুলো এ পথ বেছে নিতে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। ফলে আড়াল হচ্ছে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র। এরূপ যদি চলতে থাকে তাহলে একসময় দেখা যাবে ব্যাংকের মূলধনও ফুরিয়ে আসবে। তাতে সাধারণ গ্রাহকেরা পড়বেন বিপাকে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এ ব্যবস্থা আর কতকাল চলবে? ব্যবসা-বাণিজ্যের নামে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি ঋণগ্রহীতারা মহাবিপদে পড়েছেন বলে যে কথা বলা হয়, তা কারও কারও জন্য প্রযোজ্য হলেও অনেকের ক্ষেত্রেই এর বিপরীত চিত্র পাওয়া যায়। এসব খেলাপিরা ঋণ পরিশোধে অসমর্থ হলেও তাদের পরিবার-পরিজনদের অধিক মূল্যের গাড়ি-বাড়ি ক্রয়, বিলাসবহুল জীবনযাপনে কিন্তু বিরতি নেই। দেখে অবাক হই, অন্যের সম্পদ লুটেপুটে খেয়ে এসব ঋণখেলাপি সমাজে সবার সামনে বুক ফুলিয়ে চলাফেরা করতে এতটুকু লজ্জা বোধ করেন না। নির্লজ্জ এসব মানুষ ঋণ পরিশোধ করতে যে অপারগ, সে জন্যও তাদের এক বিন্দু অনুশোচনা করতে দেখা যায় না।

উল্লেখ্য, ঋণ অবলোপনের এই অনৈতিক অনুশীলন অনেক আগে থেকেই আমাদের দেশে চালু রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, ২০০৩ সাল থেকে ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপন করে আসছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত বছরে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। এই খেলাপি ঋণের মধ্যে আদায় অযোগ্য মন্দ ঋণ বেড়ে হয়েছে ৯১ হাজার ৫৮ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৮৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। অপরদিকে বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারের হারও বেড়েছে সমানতালে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) এক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গত ছয় বছরে দেশ থেকে ৪ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা (৪৯৬৫ কোটি ডলার) বিদেশে পাচার হয়েছে। এ হিসাবে গড়ে প্রতিবছর পাচার হচ্ছে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা। জিএফআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, দুটি প্রক্রিয়ায় এই অর্থ পাচার হয়েছে। এর মধ্যে বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং) এবং রপ্তানিতে মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং)। অর্থ পাচারের

অনেক আগে থেকে জানা গেলেও পাচার বন্ধ করার কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ সরকার নিয়েছে কি না, জানা নেই। এ কথা বলছি এই কারণে যে এই অর্থ পাচারের হার দিন দিন বেড়েই চলেছে বলে।

বর্তমান সরকারের উন্নয়নের গণতন্ত্রের হাত ধরে জিডিপির হার বেড়েছে, প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে। একই সঙ্গে ধনী লোকের সংখ্যাও বেড়েছে সমহারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, করোনার প্রায় দুই বছরে ব্যাংকে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার। অপরদিকে একই সময়ে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ৩ কোটি ২৪ লাখ মানুষ। সম্প্রতি কয়েকটি গবেষণা সংস্থার গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের দরিদ্রের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩ শতাংশ। আয় কমেছে ৫৫ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবারের। অপরদিকে আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী, দেশে এখনো অর্ধেক মানুষ দরিদ্র; যাদের বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুসারে দৈনিক আয় ১ দশমিক ৯০ মার্কিন ডলারের নিচে। প্রশ্ন হচ্ছে, বাস্তব চিত্র যদি এই হয়, তাহলে বাংলাদেশ সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরো যে নাগরিকদের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৫৫৪ ডলার বলে ঘোষণা দিয়েছে, সেই আয়ের সিংহভাগ অর্থ এ দেশের কোন শ্রেণির মানুষের গৃহে প্রবেশ করেছে? জিডিপি, প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির কথা বলে বলে এ দেশের মন্ত্রী, এমপি ও ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা যে হয়রান হয়ে যান, তাঁরা এই ধনী-গরিবের হিসাব এখন মেলাবেন কী করে?

দেশে বর্তমানে যে উন্নয়ন হচ্ছে তার ভাগীদার দেশের সাধারণ মানুষ হতে পারছে না। দেশের উন্নয়নের ফলে উপার্জিত সম্পদ যদি দেশের অধিকাংশ নাগরিকই ভোগ করতে না পারেন, তাহলে তাকে প্রকৃত অর্থেই উন্নয়ন বলা যায় কি? ধনীর ভান্ডার ভরপুর হলেই শুধু দেশের উন্নয়ন হয় না। ধনী ব্যক্তিরা আরও ধনী হলেই চলবে না। পাশাপাশি দেশের সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়নও ঘটাতে হবে। দেশের উন্নয়নের সুফল যেদিন সুষম বণ্টনের মাধ্যমে দেশের নাগরিকদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হবে, সেদিনই কেবল সামগ্রিক অর্থে বলা যাবে দেশের উন্নয়ন ঘটেছে।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর....