• বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২, ১০:২৬ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
উখিয়ায় বিশেষায়িত হাসপাতাল উদ্বোধন করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী উখিয়ায় অবৈধ টমটম, সিএনজি ও অটোরিকশার বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান শুরু উখিয়া খাদ্য গুদাম গত বুরো মৌসুমে ১ কেজি ধান সংগ্রহ করতে পারেনি ক্ষুধার যন্ত্রণায় শিশুর কান্নায় অতীষ্ট হয়ে গলা টিপে হত্যা করলেন মা! রাঙ্গুনীয়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের ৪ সন্তান‌ই বুয়েট শিক্ষার্থী! জামিন নিতে পিস্তল নিয়েই এজলাসে আসামি আজ উখিয়ায় উখিয়া বিশেষায়িত হাসপাতাল এর শুভ উদ্বোধন পুলিশের দাবি, প্রতি মাসে ১২০ কোটি টাকার ইয়াবা আনেন ধৃত রোহিঙ্গা শফিউল্লাহ মক্কা মদিনার মতো গোপালগঞ্জ আসলে শান্তি অনুভূব করি-সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালেদ। ইউরোপিয়ান জার্নালিস্ট নেটওয়ার্কের সভাপতি জামান, সাধারণ সম্পাদক অনুরূপ

পরিবেশ দূষণ, জলবায়ুর উষ্ণতা বৃদ্ধি ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ।

AnonymousFox_bwo / ৪৪ মিনিট
আপডেট শনিবার, ১৮ জুন, ২০২২

এম আর আয়াজ রবি।

সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষ প্রকৃতিকে বশ করে গড়ে তুলেছে নিজের বসবাসের পরিবেশ। প্রকৃতির বহু বিচিত্র দান, মানুষের বুদ্ধি আর নিরন্তর শ্রমের ফলে নির্মিত হয়েছে আধুনিক সভ্যতা। বলা হয়ে থাকে ‘বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ’। অথচ বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার যুগে, পরিবেশ ধবংশের জন্য বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারও কম দায়ী নয়। আবার প্রকৃতির দানকে অস্বীকার করে মানুষ আজ নিজ হাতেই ধ্বংস করে চলেছে সুন্দর এই প্রকৃতিকে। মানুষের অসাবধানতা ও অতি লোভের কারণে ভয়াবহভাবে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ।

পরিবেশ দূষণ মূলত দুটি কারণে হয়ে থাকে। একটি হচ্ছে প্রকৃতিগত কারণ, যেমন— ঝড়-বন্যা, জলােচ্ছাস, অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিকম্প ইত্যাদি। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে মানবসৃষ্ট যা কৃত্রিম, যেমন— পানিদূষণ, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, তেজস্ক্রিয়তার দূষণ প্রভৃতি। শিল্পকারখানার বর্জ্য, যানবাহনের বিষাক্ত ধোয়া ইত্যাদি বায়ুতে মিশে দূষিত করছে পরিবেশকে। বিভিন্ন জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বাতাসে বেড়ে যাচ্ছে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ। পৃথিবীর নদনদী, সমুদ্র, পুকুর,খালবিলের পানি প্রতিদিন দূষিত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। কলকারখানার বর্জ্য, ফসলি জমিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক ইত্যাদি পানিকে বিষাক্ত করে তুলছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যত্রযত্র আবর্জনা ফেলা, জমিতে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার ইত্যাদি কারণে বাড়ছে মাটিদূষণ। তাছাড়া গাড়ির তীব্র হর্ণ, মাইকের যথেচ্ছ ব্যবহার, কলকারখানার যন্ত্রের বিকট শব্দ ইত্যাদি শব্দদূষণের মূল কারণ। সব মিলিয়ে পরিবেশ দূষণ বর্তমানে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে দূষণের মাত্রা আরও ভয়াবহ। পরিবেশ দূষণের ফলে বদলে যাচ্ছে পৃথিবীর জলবায়ু।

মহান সৃষ্টিকর্তা ( আল্লাহ) এই জাগতিক পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এক মহাপরিকল্পনার অংশ বিশেষ হিসেবে। তাই তাঁরই সৃষ্টি জগত প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে চলমান অবিরত। কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়মে চলমান এই পৃথিবীতে, প্রকৃতিতে চলছে বিস্ময়কর পরিবর্তন। প্রতিনিয়ত ঘটে চলা এই পরিবর্তনে হুমকির সম্মুখীন অসংখ্য প্রাণীকুল। ইতোমধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রাণীকুলের অসংখ্য প্রজাতি। আমাদের চর্তুপাশে আমরা যদি একটু লক্ষ্য করি তাহলেই খুঁজে পাব এ পরিবর্তনের সাথে কত নিবিড়ভাবে জড়িত সৃষ্টির সেরা জীবখ্যাত মনুষ্যজাতি।এসব পরিবর্তনগুলোর মধ্যে রয়েছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, গ্রীষ্মকালের পরিধি বৃদ্ধি, অপরদিকে শীতকালের পরিধি হ্রাস পেয়েছে দৃশ্যমান হারে। অন্যদিকে শুধু যে বর্ষাকালে বৃষ্টি হচ্ছে এমন না অন্যান্য মৌসুমেও বৃষ্টিপাত হচ্ছে ব্যাপক, এর ফলে প্রায় প্রতি বছরই বন্যা দেখা দিচ্ছে। এ সবই প্রকৃতির বিস্ময়কর পরিবর্তনের ফলে ঘটছে। এ পরিবর্তন এর জন্য গবেষকরা মানুষের কর্মকাণ্ডকে দায়ী করেছেন, বিশেষজ্ঞরা গবেষণার মাধ্যমে যে ফলাফলগুলো পেয়েছেন তার বেশিরভাগই মানুষের কর্মকাণ্ডকে দায়ী করে।

বর্তমান বিশ্বে পরিবেশগত সমাস্যা একটি মারাত্মক সমাস্যা। নিজেদের অবহেলার কারনেই প্রতিদিন আমরা চারপাশে তৈরি করছি বিষাক্ত পরিমন্ডল, নিজেদের ও ভবিষ্যত প্রজন্মকে ঠেলে দিচ্ছি এক নিঃশব্দ বিষক্রিয়ার মধ্যে। ফলে ঘটছে পরিবেশের মারাত্মক অবনতি, যা আমাদের জীবন, জীবিকা ও বেঁচে থাকার জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরুপ। একসময় বাংলাদেশ ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভুমি। এ দেশের মাঠ, ঘাট, পাহাড়, পর্বত, নদী-নালা, বায়ু সবকিছু ছিল নির্মল ও বিশুদ্ধ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, মনুষ্য বাসের বা প্রাণিকুলের বেঁচে থাকার পরিবেশের প্রধানতঃ তিনটি উপাদান মাটি, পানি ও বায়ু নানা উপায়ে দূষিত হচ্ছে। এ দূষন আমরা ঘটাচ্ছি কখনো জেনে বা কখনও অবচেতন মনে।

বিশ্ববিখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘দ্য লানসেট প্লানেটারি হেলথ জার্নালে’ প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ‘বিশ্বে এখন পর্যন্ত করোনায় যত লোক মারা গেছে, প্রতি বছর তার চেয়েও অনেক বেশি মানুষ মারা যাচ্ছেন বিভিন্ন ধরনের পরিবেশগত দূষণের কারণে’ ৷

২০১৫ সাল থেকে শুরু করে ক্রমবর্ধমান বায়ু দূষণ ও বিষাক্ত সীসার কারণে বছরে ৯০ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে ৷ ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের প্রকল্প ‘গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিস’ এর ২০১৯ সালের তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন বিজ্ঞানীরা৷ সদ্য প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ‘‘মানুষ ও পৃথিবীর স্বাস্থ্যের জন্য পরিবেশ দূষণ অস্তিত্বের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে ৷ সেই সঙ্গে আধুনিক সমাজের স্থায়িত্বকে তা বিপন্ন করে তুলছে ৷” যুদ্ধ, সন্ত্রাস, ম্যালেরিয়া, এইচআইভি, যক্ষা, মাদক ও অ্যালকোহলের চেয়েও বিশ্বের জন্য পরিবেশ দূষণের প্রভাব মারাত্মক বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা ৷
উক্ত গবেষণা প্রতিবেদনের সহ-লেখক রিচার্ড ফুলার বলেন, ‘‘আমরা উত্তপ্ত পাত্রের উপর বসে আছি এবং ধীরে ধীরে জ্বলছি ৷ কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, ম্যালেরিয়া ও এইচআইভির মতো ইস্যুগুলো যতটা মনোযোগ পাচ্ছে পরিবেশ দুষণ বিষয়টি ততটা গুরুত্ব পাচ্ছে না৷’’ বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত শিল্প ও নগরায়নের কারণে সৃষ্ট বায়ু দূষণজনিত মৃত্যু সাত শতাংশ বেড়েছে ৷

এর আগে ২০১৭ সালে প্রকাশিত এই গবেষণার আরেক সংস্করণে দূষণজনিত মৃত্যুর বার্ষিক সংখ্যা ছিল ৯০ লাখ ৷ সেসময় প্রতি ছয়টি মৃত্যুর একটির জন্য দায়ী ছিল দূষণ ৷ আর বছরে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল চার দশমিক ছয় ট্রিলিয়ন ডলার ৷
এই গবেষণা থেকে দেখা যায় বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়া করোনা মহামারির চেয়েও অনেক বেশি মানুষ মারা যাচ্ছেন দূষণের কারণে৷ সবশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী কোভিড-১৯ এ এখন পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ ।

পরিবেশবিদদের মতে ২০৩০ সাল নাগাদ গ্ৰাউন্ড লেভেলের ওজন দূষণের কারণে শস্যের পরিমাণ কমে যাবে ২৬% যা উদ্বেগজনক। প্রকৃতিগত অবস্থা নিয়ে বাংলাদেশ টিকে থাকলেও আজ আর সেই অবস্থা নেই। বাংলাদেশ এখন পরিবেশ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে সারাবিশ্বে পরিচিত। একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচা তো দূরের কথা, এখন বাংলাদেশে কীভাবে টিকে থাকবে সেটা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বায়ুদূষণের দিক থেকে বরাবরই ঢাকা শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, নগরায়ন, অবাধে বৃক্ষ নিধন, পাহাড় নিধন এবং পরিবেশ সুরক্ষায় সচেতনতার অভাবে আমাদের বর্তমান পরিবেশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠেছে। কলকারখানাও যানবাহনের নানা রকম ক্ষতিকারক গ্যাস, বিভিন্ন শিল্পের বিষাক্ত বর্জ্য প্রভৃতির কারনে বাংলাদেশের পরিবেশ আজ মারাত্মক হুমকির সম্মূখীন।অবাধে বৃক্ষ নিধনের ফলে বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা নেমে যাচ্ছে, বাড়ছে বাতাসে সিসার পরিমান, বিলুপ্ত হচ্ছে নানা প্রজাতির পক্ষীকূল ও বনজ প্রানী। নদীতে পানি দূষনের ফলে ধীরে ধীরে মাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।ফলশ্রুতিতে পরিবেশ হচ্ছে দূষিত হারিয়ে ফেলছে পরিবেশের ভারসাম্য, হারিয়ে যাচ্ছে জৈব বৈচিত্রের সম্ভার। পাহাড় কেটে সাবার করে প্রাকৃতিক পেরেকখ্যাত সেই পাহাড় ধ্বংশ করে সমুদ্রপৃশ্তের উচ্চতা হ্রাস করে বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ সমুদ্রগর্ভে বিলীন হবার বিজ্ঞানীদের ধারনা বাস্তব রুপ লাভ করতে সহযোগিতা করে চলছে।

পরিবেশ বিপর্যয় সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা আশংকা করছেন বাতাসে যদি কার্বন্ডাই অক্সাইড ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে এর ফলে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের গড় তাপনাত্রা যদি ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে, এর ফলশ্রুতিতে উত্তর গোলার্ধের বরফ গলে উঁচু হয়ে উঠবে সাগরের পানির স্তর। আর বহু কোটি টন কয়লার ধোয়া আর ধুলাবালি যদি প্রাণ শক্তি প্রদেয় সূর্যালোককে পৃথিবীতে পৌছাতে বাধা দেয় তবে তার ফলাফলও হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।যদি এ কারনে পৃথিবীতে আলো আসার পরিমান বর্তমানের তুলনায় ১.৫% থেকে ২% ভাগও কমে যায়, তাহলে ক্রমে মেরু অঞ্চলের চিরস্থায়ী বরফ ছড়িয়ে পড়বে বিষুব অঞ্চল পর্যন্ত। আর পৃথিবীর বুকে নেমে আসবে প্রবল শীতের মৃত্যুর পরশ।

সমুদ্র পৃষ্টের উচ্চতা বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্লাবনজনিত ক্ষতির সম্নুখীন হতে পারে বাংলাদেশের প্রায় ১২০ হাজার বর্গকিলোমিটার অঞ্চল।এ-ই উচ্চতা যদি ১ ইঞ্চিও বৃদ্ধি পায়, দক্ষিণের দ্বীপগুলো ও সুন্দরবনের ২০% চলে যাবে সাগর গর্ভে। এতে করে উল্লেখযোগ্য হারে প্রাণি ও উদ্ভিদ প্রজাতি ধ্বংশ হয়ে যাবে। জলবায়ু পরিবর্তনে বর্ষার সময় অতি বৃষ্টিতে বন্যার প্রকোপ বাড়বে পক্ষান্তরে শীত মৌসুমে দেশের প্রধান প্রবাহমান নদীর গতি প্রবাহ কমে যাবার আশংকায় থাকবে বাংলাদেশ।

পরিবেশ দূষণ পরিবেশের ভারসাম্য তথা মানবজাতির জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। পরিবেশ দূষণ ক্রমাগত আমাদেরকে নীরবে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করছে। তাই সুখী ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে হলে পরিবেশ দূষণ অবশ্যই রোধ করতে হবে। এ জন্য আমাদের সচেতনতার কোন বিকল্প নেই। সরকারেরও উচিত পরিবেশ দূষণ প্রতিরাধে কঠোর আইন প্রণয়ন করা। আর তা হলেই আমরা একটি সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশে বসবাসের নিশ্চয়তা পাব।

লেখকঃ কলামিষ্ট এবং প্রেসিডেন্ট-বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক ফোরাম (বিএনজেএফ) উখিয়া উপজেলা শাখা ও ভাইস-প্রেসিডেন্ট- উপজেলা প্রেসক্লাব উখিয়া।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর....