• শুক্রবার, ১২ অগাস্ট ২০২২, ০৯:২১ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
নারী চিকিৎসককে গলা কেটে হত্যা, কথিত প্রেমিক কক্সবাজারের রেজা চট্টগ্রামে আটক ভোটার প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গা অধ্যুষিত সীমান্ত এলাকার জন্য ইসি সচিবালয় কর্তৃক ঘোষিত নির্দেশিকা। কক্সবাজার জেলার শ্রেষ্ঠ অফিসার ইন চার্জ মনোনীত হয়েছেন’ উখিয়া থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী নাদিম আবাসিক হোটেলে মিলল এক নারী চিকিৎসকের গলাকাটা লাশ, কথিত স্বামী পলাতক। বনের জন্য কক্সবাজার হবে মডেল জেলা-প্রধান বনসংরক্ষক কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিতে হেড মাঝিসহ ০২জন নিহত। আর্থিক খাতে লুটপাটের দায় জনগণ শোধ করবে কেন? মাদক ও ইয়াবার বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত রেখে তরুণ সমাজকে রক্ষা করুণ । কক্সবাজার জেলা বিএমএসএফ এর জরুরী সভা অনুষ্ঠিত উখিয়া স্পেশালাইজড হসপিটাল এ জনপদের চাহিদা, আশা-আকাঙ্ক্ষা পুরণে সক্ষম? নাকি শুধুই গতানুগতিক!

কক্সবাজারের অনিন্দ্য সুন্দর ‘উখিয়া’ উপজেলার নামকরণের ইতিবৃত্ত!

AnonymousFox_bwo / ৮৪ মিনিট
আপডেট শুক্রবার, ২৪ জুন, ২০২২

আইকন নিউজ ডেস্কঃ 

প্রত্যেকটি এলাকা, অঞ্চল, রাজ্য বা দেশের নাম করণের একটি সুনির্দিষ্ট উপজীব্য যেমনটি আছে, তেমনি আছে ইতিহাসের সুনিপুণ ধারাবাহিকতা। অনেকদিন যাবৎ আগ্রহ ছিল আমার প্রিয় জন্মভুমি উখিয়া এর নামকরনের সত্যিকারের ইতিহাস পরিক্রমায় উখিয়ার নামকরণ কিভাবে হল তা জানার। আমি মনে করি অনেকেই আমার মত কৌতুহলী।

উখিয়ার প্রাচীন ইতিহাস তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। একসময় সমগ্র অঞ্চলটি গভীর জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল।উনিশ শতকে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর রেকর্ডপত্রে সর্বপ্রথম ‘উখিয়া’ শব্দটির প্রয়োগ দেখা যায় ।
সি-এস(ক্যাডেসটেল সার্ভে)রেকর্ডেও ‘উখিয়া’ নামক শব্দটি লিপিবদ্ধ করা হয়।

১৮১৪ খ্রিষ্টাব্দে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর রেকর্ডপত্রে উখিয়ার ঘাট শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। অনেকেই মনে করেন ‘উখিয়ার ঘাট’ থেকে ঘাট শব্দ বাদ দিয়েই উখিয়া শব্দটির উদ্ভব হয়েছে। তবে এ ধরনের ধারণা সঠিক নয়। মূলত উখিয়া নাম থেকেই উখিয়া ঘাটের জন্ম।

ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর রেকর্ড পত্রে উখিয়া নামের পূর্বে ‘পালং’ শব্দের উল্লেখ দেখা যায়। ঐ রেকর্ড পর্ব থেকে জানা যায়, ১৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দে আরাকান থেকে কিছু নামি-দামি ব্যক্তি কোম্পানী (ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানী) শাসিত আরাকান এলাকায় পালিয়ে এসে বড় ফালং, হারবং (হারবাং চকরিয়া উপজেলার একটি ইউনিয়ন), বড়ইছড়ি (সম্ভবতঃ চকরিয়া উপজেলার বর্তমান বরইতলী ইউনিয়ন) নামক স্থানে আশ্রয় গ্রহন করে। ইংরেজদের কথিত এই ‘বড় ফালং’ বর্তমান উখিয়া উপজেলার ‘পালং’ ছাড়া অন্য কিছু নয়।

উখিয়ার নামকরণ কিভাবে এবং কখন থেকে জনবসতি শুরু হয়েছে? দেড় ডজন পালং নামের সমন্বয়ে গড়ে উঠা উখিয়া উপজেলার নামকরণের ইতিহাস রহস্যাবৃত।

আসুন উখিয়া শব্দের উৎপত্তি নিয়ে কিছুটা ধারণা নেয়ার চেষ্টা করিঃ

পূর্বে রোসাঙ্গ যেতে হলে উখিয়ার ঘাট পার হয়ে যেতে হত। তৎকালীন সময়ে এই উখিয়া ঘাটের ‘টেক্স’ আদায় করার দায়িত্ব ছিলো ‘উখি’ নামক জনৈক ব্যক্তির উপর। কালের বিবর্তনে তার নামানুসারে ঐ ঘাটের নাম হয় ‘উখি অ্য’র ঘাট’। ধীরে ধীরে এই “উখি অ্য’র ঘাট” থেকে ঘাট শব্দটি বিলুপ্ত হয়ে প্রথমে ‘উখি অ্য’ এবং পরে “উখিয়া” শব্দে রূপান্তরিত হয়েছে বলে অনেই মনে করেন।

অন্য একটি সূত্রমতে, বার্মীজ শব্দ ‘ক্যা’ থেকেই উখিয়া শব্দটির উদ্ভব হয়েছে। ‘ক্যা’ শব্দের অর্থ হল বাঘ। জনবসতির পূর্বে এই অঞ্চল ছিল গভীর অরণ্যে পরিপূর্ণ। তৎকালীন সময়ে এখানে বাঘের বসবাস ছিলো বলে জনশ্রুতি আছে। এই জন্য গভীর অরণ্যে পরিপূর্ণ ই জায়গাকে স্থানীয় মগরা ক্যা অর্থ্যাৎ বাঘের জায়গা বলে সম্বোধন করতো। কালের বিবর্তনে এই ‘ক্যা’ শব্দটি উখিয়ায় রূপান্তরিত হয়।১৫৫০খ্রিষ্টাব্দে পতুর্গীজ ঐতিহাসিক জোঁ আ দ্যা বারোস সর্ব প্রথম বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলের `descripcao do reino de bengalla’ নামের একটি ম্যাপ অংকন করেন। উক্ত ম্যাপে বাঁকখালী নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনার উত্তর পার্শ্বে ‘বাকোলী’ এবং দক্ষিণ পার্শ্বে উরিয়াতন নামে দু’টি জয়গা চিহ্নিত করা হয়।
জোঁ আ দ্যা বারোস ইন্দোনেশিয়া থেকে সাগরপথে উত্তর দিক অর্থাৎ ভারতবর্ষের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় নাফ নদীর মোহনা থেকে বাঁকখালী নদীর মোহনা পর্যন্ত এই অংশকে দ্বীপ মনে করেছিলেন। সে কারণেই উক্ত ম্যাপে ‘উরিয়াতন’ একটি দ্বীপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বাঁকখালী নদীর দক্ষিণে চিহ্নিত ‘উরিয়াতন’ এলাকাটি আধুনিক উখিয়া হওয়াই স্বাভাবিক।

১৫৮৫ সালে ত্রিপুরার রাজা অমর মানিক্যের পুত্র রাজদাহার নারায়ণের নেতৃত্বে ত্রিপুরা বাহিনী আরাকান আক্রমণ করে। রাজদাহার নারায়ণ চট্টগ্রামের কর্ণফূলী নদী অতিক্রম করে আরাকানিদের ৬টি ক্যাম্প দখল করার পর বর্তমান রামুতে এসে যাত্রা বিরতি নেন এবং রামুর দক্ষিণ পার্শ্বের উরিয়া রাজাকে আক্রমণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এই উরিয়া নামক স্থানটি রামুর দক্ষিণে হলে তা বর্তমান উখিয়া ছাড়া অন্য কোথাও হতে পারেনা। উরিয়া রাজা স্বাধীন আরাকান রাজার অধীনস্ত ছিলেন বলে জানা যায়।
উপ-মহাদেশের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ মরহুম ডঃ আবদুল করিমের মতে, আলোচিত উরিয়া অঞ্চলটি হচ্ছে বর্তমান মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশের মংডু টাউনশীপের অধীনস্ত ‘উয্যাতন’। এই উয্যাতন-এর অবস্থান বলিবাজারের উপরে। আমাদের রামু উপজেলা থেকে এই উয্যাতনের দূরত্ব কমপক্ষে ৭০ থেকে ৮০ মাইল দক্ষিণে।

কিন্তু প্রায় সোয়া ৪০০ বছর আগে সেখানে কোন ধরনের যাতায়াত ব্যবস্থা ছিলনা যার দরুণ সেখানে আক্রমণ করাও ছিলো রীতিমত অসম্ভব।
তাছাড়াও মিয়ানমারের উয্যাতনে কোন রাজার বসবাস বা প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল কিনা এমন কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এই উরিয়াতন আমাদের বর্তমান উখিয়া ছাড়া অন্য কোথাও হতে পারেনা। কাজেই কালক্রমে উরিয়া শব্দটি বিবর্তিত হয়ে উখিয়ায় রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা ব্যাপক।

আরাকান রিসার্স জার্নাল থেকে জানা যায়, আরাকানের রাজা মেং রাজাগ্রি (যাঁর মুসলমান নাম ছিল সলিম শাহ’ ১৫৯৩-১৬১২) ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে ‘উরি’ অঞ্চলে ‘টং’-এর প্রবর্তন করেন। টং (ঞঁহম) বার্মিজ শব্দ ; যার অর্থ হাজারী। এক হাজার পরিবারের এলাকাকে ‘টং’ বলে। গবেষকদের ধারণা আদি শব্দ উরি থেকেই ‘ উরিয়া’ এবং এই উরিয়া থেকেই উখিয়া শব্দের উদ্ভব।
উরিয়া রাজার আমলে তাঁর রাজ্যের সীমানা কি রকম ছিল এ ব্যাপারে ইতিহাস আমাদেরকে সাহায্য করে না। তবে আমরা অনুমান করতে পারি নাফ নদীর উত্তর ভাগ থেকে শুরু করে পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে নাফনদী ও আরাকানের কিছু অংশ এবং উত্তরে বর্তমান বাঁকখালী নদী পর্যন্ত উরিয়া রাজার উত্তর সীমানা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু একই সময়ে ‘আদম শাহ’ নামক জনৈক সামন্ত আরাকানের অধীন রামু-চকরিয়া অঞ্চলের প্রধান ছিলেন।
আদম শাহ-এর বসত বাড়ী ও দূর্গ ছিল বর্তমান রামু কোর্ট বা রামকোট-এ। রামকোর্ট বা রামু দূর্গ বরাবরই বাঁকখালী নদীর দক্ষিণ পাশেই ছিল। এতদিন পর্যন্ত এধরনের ধারণাই করে আসছিলেন অনেক ঐতিহাসিক। কিন্তু উপমহাদেশের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপচার্য ড. আবদুল করিমের মতে ‘আদম শাহ রামু-চকরিয়ার শাসক হলেও তার প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিলো চকরিয়াতেই। ত্রিপুরার রাজা অমর মাণিক্যের রাজত্বকালে ১৫৭৭-১৫৮৬ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণ চট্টগ্রাম আরাকানের অধীন ছিল এবং সেখানে আদম শাহ নামে একজন মুসলমান আরাকার রাজার সামন্ত ছিলেন, তাঁর কর্মস্থল ছিল চকরিয়া। আদম শাহের প্রশাসনিক কেন্দ্র চকরিয়াতে হওয়াতেই অমর মাণিক্যের ছেলে রাজদাহার নারায়ণ আরাকান আক্রমণ করে চকরিয়া পর্যন্ত দখল করে নেয়। আর আদম শাহ ত্রিপুরা রাজার বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে আরাকান রাজার বিরুদ্ধাচরণ করে ত্রিপুরা রাজার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। আদম শাহের প্রশাসনিক কেন্দ্র রামুর রাম কোর্ট হলে ত্রিপুরা বাহিনীকে বাঁকখালী নদী পেরিয়ে আদম শাহকে পরাজিত করতে হতো। এতে করে প্রমাণিত হয় রাম কোর্টে আদম শাহের কোন কর্তৃত্ব ছিলো না। এখানে অন্য কোন সামন্ত রাজা ছিলো। কে সেই রাজা ? এব্যাপারে ইতিহাস আমাদেরকে মোটেও সাহায্য করেনা।
বঙিম চন্দ্র চাকমা রচিত ‘চাকমা জাতিও সমসাময়িক ইতিহাস’ গ্রন্থ এবং “ত্রিপুরার ইতিহাস রাজমালা” গ্রন্থের বিবরণ থেকে জানা যায়, পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ত্রিপুরার রাজা ধন্য মানিক্য রাম্বু তথা রামু ও উড়িয়া রাজ্য জয় করার জন্য সেনাপতি চয় চাক ও রায় চাকের নেতৃত্বে উরিয়া রাজ্যে অভিযান প্রেরণ করেন এবং এর উত্তরাংশ দখল করতে সক্ষম হন। কিন্তু প্রমত্তা বাঁকখালী নদী অতিক্রম করে উরিয়া রাজ্যের দক্ষিণাংশ আক্রমণ করার সাহস পায়নি ত্রিপুরার সেনাপতিদ্বয়। কাজেই এখান থেকে প্রমাণিত হয় যে, বাঁকখালী নদীর উত্তরেও উরিয়া রাজ্যের অংশবিশেষ ছিল।
আর এই উরিয়া রাজ্যের প্রশাসনিক কেন্দ্রস্থল ছিল বর্তমান উখিয়া।

(তথ্য সংগৃহীত)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর....