• রবিবার, ০২ অক্টোবর ২০২২, ০৭:৪২ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
এ বছরে নোবেল প্রাইজের জন্য মনোনীত বাংলাদেশী চিকিৎসক রায়ান সাদী কক্সবাজারে ৪২ কোটি টাকায় বনায়ন, নতুন রূপে সাজবে হিমছড়িসহ কক্সবাজার জেলা। পুলিশের প্রশিক্ষণ খাতে এনজিওগুলো শত শত কোটি টাকা অনুদান পেয়েছে : বেনজীর আহমেদ  রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গত রাতেও ০১ জন খুন, অস্থিতিশীল অবস্থায় স্থানীয়রাও চরম আতংকে। র‍্যাব-৭ কর্তৃক ২ লক্ষ ৩৮ হাজার ইয়াবাসহ ০৩ জন আটক। র‍্যাব-৭ কর্তৃক ২ লক্ষ ৩৮ হাজার ইয়াবাসহ ০৩ জন আটক। উদ্ধারকৃত ইয়াবার আনুমানিক মুল্য ৬ কোটি। উখিয়া রেঞ্জকর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে উদ্ধারকরা ৩ শতাধিক বক অবমুক্ত করা হয় উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এক রোহিঙ্গা ভলান্টেয়ারকে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নির্মমভাবে খুন। ঘুংধুম সীমান্তে চরম উত্তেজনায় এসএসসি ও সমমানের পরিক্ষার কেন্দ্র পরিবর্তন শাড়ি পরে কলেজে গেল ছেলে, ছবি পোস্ট করলেন ‘গর্বিত’ বাবা!

রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে এইডস সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি, রোধ করা না গেলে চরম ঝুঁকিতে পড়বে দেশ

AnonymousFox_bwo / ১৩৭ মিনিট
আপডেট বৃহস্পতিবার, ১৮ আগস্ট, ২০২২

রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে এইডস সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি, রোধ করা না গেলে চরম ঝুঁকিতে পড়বে দেশ-বিশিষ্টজনদের মতামতের মাধ্যমে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এম আর আয়াজ রবি

অত্যন্ত মানবিক কারণে পার্শ্ববর্তী দেশ মায়ানমার থেকে জোরপুর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু এই মানবিকতা আজ অভিশাপে পর্যবসিত হতে চলছে আমাদের প্রিয় মার্তৃভুমি। তাদের কারনে এখন নানামুখী ঝুঁকিতে আমাদের প্রিয় স্বদেশ। রোহিঙ্গারা আজ শুধু অলস জনসংখ্যার বোঝাই নয়, অধিকন্তু আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরুপও। তাছাড়া তাদের রয়েছে মজ্জাগত কিছু স্বভাব। সন্ত্রাসি কাজকর্ম, হত্যা,খুন, রাহাজানি, দাঙ্গা-হাংগামা, শান্তি শৃংখলার অবনতি, নিজেদের মধ্যে অন্ত;দ্বন্ধ-স্বার্থের দ্বন্ধ, আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্ধ এবং সাথে আছে ইয়াবা, মাদক, স্বর্ন চোরাচালান, আইস,অপহরন,মুক্তিপন আদায়, মানবপাচারসহ জন স্বাস্থ্যেরক্ষেত্রেও বড় ধরনের হুমকি ও ঝুঁকি বয়ে এনেছে এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। তাদের আশ্রয় দেয়ার পর থেকে কক্সবাজারে প্রতি বছরই বাড়ছে এইচআইভি বা এইডস আক্রান্ত ও শনাক্তের সংখ্যা।

ইংরেজি Sexually Transmitted diseases (STD) এবং Sexually Transmitted Infection (STI) রোগ বা সংক্রমণগুলো সাধারণত অনিরাপদ যৌনমিলনে মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। আবার কিছু কিছু যৌনরোগ যৌনমিলন ছাড়া অন্য উপয়েও সংক্রমিত হতে পারে। যৌন রোগসমূহ ভাইরাসঘটিত অথবা ব্যকটেরিয়া ঘটিত হতে পারে। তেমনি এক মারাত্মক যৌনবাহিত রোগ হচ্ছে এইচ আইভি ভাইরাস বা এইডস।
রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে এই মারাত্মক যৌনবাহিত রোগ এইডস। বিশেষ করে, কক্সবাজারে দিন দিন বাড়ছে এই রোগের আক্রান্তের সংখ্যা।

সম্প্রতি এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, গত ৩১-শে জুলাই-২০২২ তারিখ পর্যন্ত কক্সবাজারে মোট এইডস রোগীর সংখ্যা ৯৫৪ জন। এর মধ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ৭৭১ জন এবং বাঙালি ১৮৩ জন। চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৭১০ জন, যেখানে রোহিঙ্গা ৬১২ জন এবং হোস্ট কমিউনিটি রয়েছেন ৯৮ জন। এ পর্যন্ত এইডস আক্রান্ত হয়ে ৬১ জন রোহিঙ্গা ও ৫৭ জন হোস্টের মৃত্যু হয়েছে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের মধ্যে এইডস আক্রান্তের হার বেশি হওয়ায় দিন দিন এ ঝুঁকি বাড়ছে স্থানীয়দের মাঝেও। ২০১৫ সাল থেকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে এইচআইভি স্ক্যান করার কার্যক্রম শুরু হয়। ব্যাপকভাবে রোহিঙ্গা আসার পর ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত কক্সবাজারে ৫৩৮ জনের শরীরে এইচআইভি ভাইরাস শনাক্ত হয়। এদের মধ্যে ৩৯৫ জনই রোহিঙ্গা।
তবে ২০২২ সালের জুন মাস পর্যন্ত কক্সবাজারে এইডস রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৫৪ জনে। তার মধ্যে ৭৭১ জনই রোহিঙ্গা। আর সঠিক এবং বিশালভাবে এইচআইভি স্ক্যান করা হলে এ সংখ্যা আরও কয়েকগুণ বাড়তে পারে’ বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের এআরটি অ্যান্ড এইচআইভি ফোকাল পারসন মো. আশিকুর রহমান বলেন, ‘এখনো পুরোটাই সংশ্লিষ্টরা স্ক্যানিংয়ের আওতায় আসেনি। সে জন্য আসলেই ধারণা করা যাচ্ছে না এবং এখনই সম্পূর্ণভাবে বলা সম্ভব হচ্ছে না রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঠিক কি পরিমাণে এইডস সংক্রমিত রোগী রয়েছে’।
তিনি আরও বলেন, ‘এক জরিপে জানা যায়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এইডস ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম মিয়ানমার। রোহিঙ্গাদের মধ্যে এইডস আক্রান্ত হবার হার বেশি হওয়ার কারনে অত্যন্ত ঝুকির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশও’।

উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রনজন বড়ুয়া রাজন বলেন, ‘রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে একটা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে আমরা আটকে রাখতে পারছি না। বাইরের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের অবাধ চলাফেরা আছে। বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের মাঝে এটার হার যদি বাড়তে থাকে অবধারিতভাবে আমাদের মধ্যেও সেটার প্রভাব পড়তে পারে’।

এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের এইডস রোগ শনাক্ত করার পাশাপাশি তাদের তদারকির বিষয়টি গুরুত্ব দেন শরণার্থী ত্রাণ প্রত্যাবাসন কমিশনের স্বাস্থ্য সমন্বয়ক ও স্বাস্থ্যসেবা অধিদফতর।
নতুন ও পুরনো মিলে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি আশ্রয় শিবিরে বসবাস করছে ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গারা। আর স্থানীয় বাসিন্দা রয়েছে ৫ লাখের মতো।
এইচআইভি-এইডস নিয়ে কাজ করা এনজিও ও কক্সবাজার সদর হাসপাতালের এইচআইভি ট্রিটমেন্ট সেন্টার সূত্রে পাওয়া গেছে এক ভয়াবহ চিত্র।

তথ্য মতে, কক্সবাজারে আশঙ্কাজনক বিস্তার ঘটছে এইডসের। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এইডস রোগের বিস্তার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি স্থানীয়রাও রয়েছে এইডস ঝুঁকিতে। পেশাদার-অপেশাদার যৌনকর্মী ও মাদকাসক্তদের অবাধ যৌনাচারের কারণে এ রোগ বাড়ছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ও এইচআইভি ফোকাল পারসন ডা. আশিকুর রহমান বলেন, ‘২০১৫ সাল থেকেই কক্সবাজার সদর হাসপাতালে এইচআইভি বা এইডস স্ক্যানিংয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। যেখানে এইডস নির্ণয়, কাউন্সিলিং ও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের বাইরে যারা আছেন, তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসার আওতায় আনার বিষয়ে আমরা কাজ করছি। গত ৬ জুলাই-২২ পর্যন্ত ৭১০ জনের শরীরে এইচআইভি ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে। হিজড়ার শরীরেও এইচআইভির জীবাণু পাওয়া গেছে। এ রোগে জেলায় আক্রান্ত ৬১ রোহিঙ্গাসহ ১১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
তবে, এইডস আক্রান্ত জীবিতরা কে, কোথায়, কোন অবস্থায় আছে তার কোনো হিসাব সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে নেই’।

ডা. আশিকুর রহমান আরও যোগ করেন, ‘আমাদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। তারা ভিন্ন রোগ নিয়ে চিকিৎসার জন্য আসছে কিন্তু বিভিন্ন পরীক্ষায় ধরা পড়ছে এইচআইভি। তারা তাদের নিজের অজান্তেই বয়ে বেড়াচ্ছে এইচআইভি জীবাণু। তাদের জীবনাচারে কোন প্রকার নিয়ন্ত্রন তো নেই, অধিকন্তু গাদাগাদি অবস্থান ও বিভিন্ন জনের সাথে মেলামেশা ও সংস্পর্শে গিয়ে তা মারাত্মক আকার ধারন করছে’।

এইডস/এইচআইভি প্রতিরোধে জেলা সদর হাসপাতালে নানা উদ্যোগ ছাড়াও মাঠপর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে উখিয়া ও টেকনাফে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার ১২টি টিম কাজ করছে বলে জানা গেছে।

চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টরা অনেকেই বলছেন, কক্সবাজার এইডসের জন্য এখন বিপজ্জনক এলাকা। রোহিঙ্গারা যে হারে এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে সে তুলনায় শনাক্ত হচ্ছে খুবই কম। প্রকৃত অর্থে আক্রান্তের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিভিন্নসুত্রে জানা যায়, কক্সবাজারের বিভিন্ন হোটেল, মোটেল ও গেস্ট হাউসে ৫ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা তরুণীর নিয়মিত যাতায়াত। তারা অনিরাপদভাবেই দেশি-বিদেশি পর্যটক ও স্থানীয়দের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করছে। এতে কক্সবাজারে এই রোগ ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। রোহিঙ্গা যৌনকর্মী ছাড়াও পর্যটন শহর হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রোজী রোজগারের উদ্দেশ্যে যৌনকর্মীদের ব্যাপকহারে কক্সবাজার আগমনও এইডস বিস্তারের আরেকটি অন্যতম কারণ।

কক্সবাজারের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এইচআইভির বিস্তারের নেপথ্যে রয়েছে অসচেতনতা। রয়েছে সামাজিক নানা কুসংস্কার। এসব মিলে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অন্য সব রক্ষণশীল সমাজের মতোই কারো দেহে এইচআইভি পাওয়া গেলে তাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হচ্ছে। যাদের দেহে এই ভাইরাস পাওয়া গেছে তারাও চিকিৎসা নিতে গড়িমসি করে’।

রোহিঙ্গারা এখন ক্যাম্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই জানিয়ে কক্সবাজার জেলা বিএমএসএফ এর সাধারন সম্পাদক মোঃ শহীদুল্লাহ মেম্বার বলেন, “কক্সবাজার একটি পর্যটন নগরী। এখানে সারাদেশ ও বিশ্ব থেকে পর্যটকরা আমোদ, স্ফূর্তি, বিনোদন ও মজা করার জন্য আসেন। এখানকার অনেক হোটেল-মোটেল বা স্পা সেন্টারে রোহিঙ্গা তরুনীরা বিভিন্ন দালালের মাধ্যমে যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। তাছাড়া দেশ বিদেশের অনেক যৌনকর্মীর অভয়ারন্য এই পর্যটননগরী কক্সবাজার। তাই অতি সহজে যে কেহ তার শারীরবৃত্তীয় যৌনচাহিদা পূরণ করার সহজ ক্ষেত্র সৃষ্টি হওয়ায়, এখানে এইডস এর মতো প্রানঘাতী রোগের সহজ বিস্তার হবার সুযোগ থাকায়-এইডস আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে স্থানীয়দের মধ্যেও এইডস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।”

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ) কক্সবাজার জেলা সভাপতি আবদুল্লাহ আল মামুন আনসারি অত্র প্রতিবেদককে জানান, ‘ বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার দেশের আকর্ষণীয় পর্যটন নগরী। বিনোদনের উপজীব্য বিষয় হিসেবে ইতিমধ্যে অবাধ মেলামেশা ও পতিতাবৃত্তিসহ নানা কারনে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে শুরু করে কক্সবাজার হোটেল-মোটেল জোন হয়ে সারাদেশে এইডস ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, বিভিন্ন পত্র পত্রিকা, ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ইতিমধ্যে এইডস রোগির আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে খবর প্রচারিত হয়েছে। কাজেই এক্ষুনি তার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহন না করলে বাংলাদেশের সর্বত্র এইডস ভয়াবহ রুপ নিতে বেশি সময় লাগবে না।‘

তথ্য সংগ্রহে জানা যায়, উখিয়া মধুর ছড়া এলাকার হোপ ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে এইচআইভি নিয়ে এসেছেন এক রোহিঙ্গা নারী। তিনি মিয়ানমারে থাকাকালিন গনধর্ষনের শিকার হয়ে এসেছেন বলে জানান। তিনি নানা শারীরিক সমস্যা নিয়ে বারবার হাসপাতালে আসতে শুরু করলেও, পরে বিভিন্ন পরিক্ষার মাধ্যমে জানতে পারেন-তিনি এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত বা এইচ আইভি পজিটিভ।
এক নারী এনজিও কর্মীর সহযোগিতায় তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই রোগের কারণে রীতিমতো একঘরে হয়ে পড়েছেন তিনি। কেউ তার সঙ্গে থাকতে চায় না। একসঙ্গে খেতে চায় না। তার পরিবারের লোকজন পর্যন্ত কথা বলেন না ঠিকমতো। আর প্রতিবেশীরা একেবারেই কথা বলেননা। তিনি বলেন, ‘আমাকে সবাই চরিত্রহীন মনে করে। কষ্ট লাগে যখন আমার ছেলে আমার সঙ্গে কথা বলে না। তারে আদর করতে পারি না’।

এইচআইভি আক্রান্ত আরেকজন রোহিঙ্গা পুরুষ জানান, তিনি মালয়েশিয়াতে ছিলেন। সেখান থেকে নিয়ে এসেছেন এই রোগ। এইডস’এ আক্রান্ত হবার কারণেই তাকে মালয়েশিয়া থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। তিনি ধারণা করেন, মালয়েশিয়াতে অবৈধ মেলামেশার কারণেই এই রোগ হয়ে থাকতে পারে।

এইচআইভি আক্রান্ত রোগীরা যেকোন রোগকেই সাধারন রোগ মনে করেন। অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে আসেন না। আর আসলেও ডাক্তারের পরামর্শমতে চলেন না। তাছাড়া ক্যাম্পে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারন হচ্ছে যৌনজীবনে কোন প্রকার নিয়ম নীতি মেনে না চলা। তাদের অধিকাংশই ঝাড় ফুকের উপর বিশ্বাস ও গভীর আস্থা রাখেন। অধিকাংশ রোগীই হাসপাতালে আসেন রোগ জটিল আকার ধারন করার পর বা রোগ কন্ট্রোলের বাইরে চলে গেলে।

কক্সবাজারের সাবেক সিভিল সার্জন ডাঃ আব্দুস সালাম এ ব্যাপারে জানান, ‘আমরা এইডস নিয়ন্ত্রণে প্রথম থেকেই তৎপর। আমাদের এসব রোগীদের প্রথমে কক্সবাজারে নিয়ে এসে চিকিৎসা দেওয়া হতো। এরপর উখিয়ার হাসপাতালেও একটি ইউনিট স্থাপন করি। পরীক্ষার জন্য সেখানে আধুনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে’। তিনি আরও বলেন, ‘অসচেতনতার কারণেই ছাড়াচ্ছে এসব রোগ। তাদের বারবার সচেতন করবার নানা কর্মসূচি নেয়া হলেও, তাদেরকে সচেতনতা করা খুব মুশকিল হয়ে পড়ছে’।

রোহিঙ্গাদের মধ্যে এইডস সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া আশঙ্কাজনক উল্লেখ করে কক্সবাজার সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, “রোহিঙ্গারা বেশি আক্রান্ত হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে, মিয়ানমারে এইডস আক্রান্তের হার বেশি। আক্রান্তরা বেশিরভাগ মিয়ানমার থেকে জীবাণু নিয়ে এসেছে।”
“তাঁরা খুব বেশি অসচেতন। স্ত্রী এইডসে আক্রান্ত হলে স্বামী যে আক্রান্ত হতে পারে এই বিষয়টিও বেশিরভাগ রোহিঙ্গা জানে না,” বলেন তিনি।
তিনি বলেন, “এইডস ছড়ানোর অন্যতম কারণ হচ্ছে অনিরাপদ যৌন মিলন। কিন্তু রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগই নিরাপদ বা অনিরাপদ মিলনের বিষয়টি বোঝেন না। স্বাস্থ্য বিষয়ে নানা অজ্ঞতা, কুসংস্কার কাজ করে তাঁদের মধ্যে।”
২০১৭ সালে ব্যাপকহারে রোহিঙ্গারা কক্সবাজারে আসার পর ওই জেলায় এইচআইভি এইডস আক্রান্তের হার বেড়ে যায় বলে জানান ডা. মাহবুব।
তিনি জানান, ‘ ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে এ বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত সাড়ে ছয় বছরে কক্সবাজারে এখন এইডস আক্রান্তের সংখ্যা এখন ৯৮৮ জন। এদের মধ্যে রোহিঙ্গা রোগীর সংখ্যা ৭৯৪। ১৯৩ জন স্থানীয় বাসিন্দা’।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের পর ৫৯ জন রোহিঙ্গা এবং ৫৭ জন বাংলাদেশিসহ ১১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
আক্রান্ত ৯৮৮ জনের মধ্যে ৫০৯ জনই নারী, যাদের মধ্যে ৯১জন রোহিঙ্গাসহ গর্ভবতী নারীর সংখ্যা একশ। এ ছাড়াও আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ৩৬৮ জন, শিশু ১১৩ জন এবং তিনজন হিজড়া রয়েছেন বলে জানান তিনি।

“কক্সবাজারে এইডস উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে মন্তব্য করে জেলার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. আশিকুর রহমান বলেন, “এখন গণহারে এইচআইভি পরীক্ষা করার সময় এসেছে।”
হাসপাতালে বিনামূল্যে এইচআইভি পরীক্ষা এবং ঔষধসহ সব সেবা দেওয়া হয় জানিয়ে ডা. আশিক বলেন, “এইডস আক্রান্ত হবার পর মূলত: কাউন্সেলিংই প্রধান চিকিৎসা।”
“এইচআইভি পজিটিভ হবার পর অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এ সময় মনোবল শক্ত করার জন্য এবং তাদের জীবনাচরণ কেমন হওয়া উচিৎ এসব বিষয়ে কাউন্সেলিং করা হয়,” বলেন তিনি।
বর্তমানে আক্রান্তদের মধ্যে ৭২৬ জন চিকিৎসার আওতায় আছেন। এর মধ্যে ৫০৭ জনকে সদর হাসপাতালে আর ২১৯ জনকে উখিয়া হেলথ কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান ডা. আশিক।
ডা. আশিক বলেন, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে এইচআইভি আক্রান্ত গর্ভবতী মায়েদের জন্য ‘প্রিভেনশন মাদার টু চাইল্ড ট্রান্সমিশন’ (পিএমসিটি) নামে একটি প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে। এই কর্মসূচিতে এইচআইভি পজিটিভ গর্ভবতী মায়ের গর্ভের সন্তান যেন এইচআইভি নেগেটিভ হয়, সেজন্য সেবা দেওয়া হচ্ছে।
প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি।
অল্প কিছুদিন পুর্বে, উখিয়ার জামতলী ১৫ নম্বর শিবিরের এইচ ব্লকের মো. ইসমাইল তাঁর চার বছরের এইডস আক্রান্ত কন্যা শিশুকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আনেন।
ইসমাইল বলেন, “শিশুর ওজন কমে যাচ্ছিল; জ্বর, ডায়রিয়া লেগেই ছিল। ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেলে এইডস পরীক্ষা করাতে বলেন, এরপর পরীক্ষায় এইচআইভি ধরা পড়ে।” তিনি বলেন,
“সন্তান কীভাবে আক্রান্ত হয়েছে বিষয়টি বুঝতে পারছিনা। মেয়েকে ডাক্তার ঔষধ দিয়েছে। আর বলেছে ১৪ দিন পর পরিবারের সবাইকে এইডস পরীক্ষা করাতে”।

“রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা হাসপাতালে সেবা নিতে আসছে, তাদের কেইস স্টাডি করে জানতে পারছি, তাদের অনেকেই শরীরে এইচআইভি ভাইরাস বহন করছে, কিন্তু টেস্টের আওতায় আসেনি। এ অবস্থায় শিবিরগুলোতে ব্লক ভিত্তিক টেস্ট করানো হলে আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বাড়বে বলে ধারনা করা যায়,” বলেন ডা. আশিক।
রোহিঙ্গা শিবিরে এইডস এর ভয়াবহ বিস্তার রোধে দ্রুত ব্যাপকহারে এইচআইভি শনাক্তকরণের উদ্যোগ নিতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, “প্রথমে শনাক্তকরণ, এরপর চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।”

রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়দের মধ্যেও এ রোগ ব্যাপক হারে ছড়াতে পারে এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে ডা. আশিক আরও জানান, “গত বছরের জুলাই থেকে এ বছর জুন পর্যন্ত এক বছরে ১ হাজার ৩৪২ জনের এইচআইভি টেস্ট করা হয়। এদের মধ্যে ১২৯ জন এইচআইভি পজিটিভ রোগী পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে ১১৯ জন রোহিঙ্গা”।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের আগে এবং পরে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন প্রায় ১৪ লাখ। তারা কক্সবাজারের উখিয়া এবং টেকনাফের ৩৪টি অস্থায়ী আশ্রয় শিবির এবং নোয়াখালীর ভাসানচরে অবস্থান করছেন।
কক্সবাজার সিভিল সার্জন ডা. মাহবুব জানান, “এইডস প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিভাগের নানা প্রচার, কাউন্সেলিং ছাড়াও সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা এখন এইডস সচেতনতায় কাজ করছে। সম্প্রতি টুরিস্ট পুলিশও কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে”।
তিনি আরও যোগ করে বলেন, “কক্সবাজার সদর হাসপাতাল এবং উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিনামূল্যে এইচআইভি পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ ছাড়াও সদর হাসপাতালে এন্টি রেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) সেন্টার আছে, যেখানে এইডস রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং কাউন্সেলিং করা হয়”।
রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়দের এইডস-এ আক্রান্তের ঝুঁকি বাড়ছে জানিয়ে সিভিল সার্জন বলেন, ‘হাসপাতালে সাধারণ চিকিৎসা নিতে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে কারও লক্ষণ আছে মনে হলেই, তাদের এইচআইভি পরীক্ষা করা হচ্ছে’।

কক্সবাজার টুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম বলেন, “বর্তমানে কক্সবাজারে এইডস-এর যে বিস্তার দেখা দিয়েছে, তা উদ্বেগজনক এবং পর্যটনের জন্য তা বড়ো হুমকি।”
“এখানকার হোটেল মোটেলসহ স্পা সেন্টারগুলোতে অসামাজিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্পা সেন্টারে কর্মী নিয়োগের সময় এবং প্রতি তিন মাস পর পর এইচআইভি টেস্ট করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে,” বলেন তিনি।
গত ১০ আগস্টের মধ্যে সব স্পা সেন্টারের কর্মীদের বিস্তারিত তথ্য টুরিস্ট পুলিশ অফিসে জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান রেজাউল করিম।
সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে বর্তমানে এইডস সংক্রমিত হয়েছেন ১৪ হাজার মানুষ। আক্রান্তদের মধ্যে ৮৪ শতাংশ রোগী চিকিৎসার আওতায় আছেন।

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিষ্ট এবং
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক- কক্সবাজার জেলা শাখা, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ) ও ভাইস প্রেসিডেন্ট উপজেলা প্রেসক্লাব উখিয়া।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর....