ঢাকামঙ্গলবার , ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩
আজকের সর্বশেষ সবখবর

কক্সবাজারের দক্ষিণের জনপদ ‘উখিয়া উপজেলা’র উন্নয়ন ধারণা ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা।

admin
সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৩ ৮:১১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

। এম আর আয়াজ রবি।।
কোনো দেশের উন্নয়ন বলতে সত্যিকার অর্থে সেই দেশের গ্রামীণ পর্যায়ের উন্নয়নকে সবার আগে মুল্যায়ন করা দরকার।শুধু সিটি শহরগুলোর উন্নয়ন মানে দেশের উন্নয়ন নয়। কথায় বলে, ‘কোন ব্যক্তির শুধু মুখের শ্রী বা মুখের হ্রষ্টপোষ্টতা মানেই একজনের শারীরিক সুস্থতা নয়’। সারা শরীরের সুস্থতা হচ্ছে একজনের সামষ্টিক সুস্থতা। তাই শুধু সিটি এলাকার উন্নয়ন বা রাজধানীর উন্নয়ন মানে সামষ্টিক দেশের উন্নয়ন কোনভাবেই নয়। সেই আশির দশকে বলা হতো, ৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে, বাংলাদেশ বাঁচবে। এখনও স্বাধীন বাংলাদশের লাল সবুজের পতাকা উড্ডীন, তাই সেই অর্থে বাংলাদেশ বেঁচে আছে কিন্তু আমাদের দেশের গ্রামগুলো শহরের তুলনায়সুযোগ সুবিধার দিক দিয়ে যোজন যোজন পিছিয়ে। বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনার, গ্রামকে শহরে রুপান্তরের ঘোষনা গ্রামের ভৌত, রাজনৈতিক, সামাজিক ও অবকাঠামগত উন্নয়ন চোখে দেখার মত। তিনি রীতিমত তাঁর একক প্রচেষ্টায় গ্রামীন অর্থনৈতিক উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অবশ্য এজন্য বলিষ্ট দেশপ্রেমিক নের্তৃত্ব যেমন প্রয়োজন, ঠিক তেমনি সম্পদের সুষ্ট বন্টনের প্রয়োজনও অত্যাবশ্যক। একজন সুদক্ষ ও দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি ছাড়া আশপাশের গ্রামতো নয়ই, শুধু তাঁর নিজগ্রাম ও উন্নয়নের ছোঁয়া পায় না।

উন্নয়ন প্রসংগে অবতারনা করতে গিয়ে উন্নয়ন ধারনাকে নিম্নোক্তভাবে ব্যাখ্যা করা যায়-
‘উন্নয়ন’ শব্দের অর্থ হলো উন্নতি হতে যাচ্ছে এমন অর্থাৎ উন্নয়ন হলো পরিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া, যা বস্তুগত ও মানসিক উভয় ব্যাপার। কোনো সমাজ বা দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, মানসিক, চিন্তাগত ও সাংস্কৃতিক অবস্থা ইত্যাদির পরিবর্তন (উন্নতি) হওয়াই হলো উন্নয়ন। এসব বিষয়ের সুসংগঠিত কাঠামো গঠনপূর্বক উৎপাদনমুখী প্রযুক্তি ব্যবহার, শ্রম, মেধা ও পুঁজির সঠিক প্রয়োগসংবলিত ব্যবস্থা থেকে প্রাপ্ত সুফল সমাজ বা দেশের জনগণের চিন্তাচেতনায় যৌক্তিকভাবে নিবেদন করলে জনগণের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক যে উন্নতি সাধন হয় তা-ই হলো উন্নয়ন। এ উন্নয়ন প্রত্যয়টি শুধু Economic নয় বরং Human problem-ও বটে। উন্নয়নের সঙ্গে যেমন সমাজ ও মানুষ জড়িত, তেমনি Non-economic Factor-ও সম্পৃক্ত। অর্থাৎ উন্নয়ন শুধু পরিমাণগত, পরিমাপগত ও সাংখ্যিক উন্নতি নয় বরং Values, Tradition, Arts, problem এবং Culture ইত্যাদি বিষয়ও উন্নয়ন প্রত্যেয়টির সঙ্গে সম্পৃক্ত। অতএব আমরা বলতে পারি উন্নয়ন হলো কোনো সমাজ বা দেশের নাগরিকদের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত সামগ্রিক বিষয়ের উন্নতি সাধন, যেখানে সব বিষয় সমান গুরুত্ব পায়।
উন্নয়নের মূল বিষয় বা মন্ত্র হলো ‘সমাজে এমন পরিবর্তন সাধিত হবে যাতে জনগণ ক্রমান্বয়ে ব্যাপক পরিধিতে সুযোগ-সুবিধা এবং পছন্দ-অপছন্দের স্বাধীনতা পাবে ও স্বনির্ভর হবে।’

আমার দৃষ্টিতে উখিয়া উপজেলার উন্নয়ন-সম্পর্কিত উল্লিখিত বক্তব্যই হলো উন্নয়নের গ্রহণীয় সংজ্ঞা, যা অনেকের মতের সঙ্গে হয়তো অভিন্ন হবে। প্রকৃত অর্থেই উন্নয়ন বিষয়টি ব্যাপক। উন্নয়নের ক্ষেত্রে কতগুলো শর্ত রয়েছে। যেমন- (১) সমস্ত জমি উৎপাদনে ব্যবহারযোগ্য, (২) কৃষি কাঠামোর উৎপাদনমুখীতা, (৩) ভূমির সরবরাহ সীমাবদ্ধ, (৪) শ্রম ও পুঁজির পরিবর্তনশীলতা, শ্রমশক্তির সঠিক ব্যবহার এবং শ্রম সরবরাহ মূল্য স্থিতিশীল, (৫) প্রযুক্তিগত জ্ঞানের প্রসার ও প্রয়োগ, (৬) জনসংখ্যা ও সম্পদের ভারসাম্য, (৭) শিক্ষার বিস্তার, (৮) অর্থনৈতিক বুনিয়াদ সৃষ্টি, (৯) বাজার পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক, (১০) প্রাকৃতিক সম্পদের সদ্ব্যবহার, (১১) জনগণের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, (১২) সুসংহত সমাজব্যবস্থা, (১৩) শিল্পের উন্নতি সাধন ও মূলধন গঠন, (১৪) বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস এবং (১৫) বিশ্বায়নের সঙ্গে যৌক্তিক সমন্বয় (১৬) এনজিও/আইএনজিও কর্তৃক হোস্ট কমিউনিটির বরাদ্দকৃত ৩০% এর সঠিক ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করণ, (১৭) সরকারী অনুদান ও জাতীয় পর্যায়ের গ্রাম ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের বরাদ্দগুলোকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো।
উল্লিখিত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট, উন্নয়ন কথাটি যত সহজ বলে মনে হয় বাস্তবে তা তত সহজ নয়। এর ধারণাগত সমস্যা ও বৈচিত্র্য রয়েছে। উন্নয়ন সমস্যা বিশ্বে একটি বড় সমস্যা। উন্নয়ন শুধু গতানুগতিক অর্থে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয় বরং উন্নয়ন আরো ব্যাপক অর্থ বহন করে, যেখানে অ-অর্থনৈতিক বিষয়ও সম্পৃক্ত। আবার স্থান-কাল-পাত্রভেদে উন্নয়নের সংজ্ঞাও ভিন্ন হতে দেখা যায়। কারণ দরিদ্র দেশের উন্নয়ন ও উন্নত দেশের উন্নয়ন একই অর্থ বহন করে না। এক পক্ষের কাছে উন্নয়নের অর্থ আরো বিত্ত, আরো বৈভব, আরো বিলাস। আর অপর পক্ষের কাছে উন্নয়নের অর্থ হলো জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ, জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা। এদিক থেকে উন্নয়ন সমস্যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমস্যা বলে প্রতীয়মান হয়। অতএব উন্নয়ন প্রত্যয়টি অত্যন্ত জটিল। এর মধ্যে রয়েছে পরিবর্তনশীলতা ও গতিশীলতা।

তাই দক্ষিণের জনপদ উখিয়ার উন্নয়ন ধারনায় বিগত দশক গুলো থেকে গত এক দেড় দশক গ্রামীন জনপদের উন্নয়নের সুতিকাগার হিসেবে কাজ করেছে। এই গ্রামীন অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য উখিয়ার বিভিন্ন স্তরের নেতা, নের্তৃ, সমাজ সেবক, সমাজ সংস্কারক, পেশাজীবি, সাংবাদিক সমাজ, অত্র জনপদের সাধারন আম-জনতার ভুমিকা খুবই গুরুত্বপুর্ণ।
বিশেষ করে গত দশক ও চলমান দশক গ্রামীন জনপদের উন্নয়নে যুগান্তকারী ভুমিকা পালন করেছে। নব্বই দশক বা একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে উখিয়া জনপদ ছিল এক ছন্নছাড়া গ্রামীন জনপদ। এলাকার অধিকাংশ মানুষের ‘তেল আনতে পান্তা পুরোয়’ অবস্থা বিদ্যমান ছিল। আমার মনে হয় বাংলাদেশের অবহেলিত, অনগ্রসর এলাকাগুলোর মধ্যে অত্র অঞ্চল ছিল অন্যতম। শিক্ষা-দীক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিকিতসাসেবা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তিসেবা, চিত্তবিনোদন সেবা, রাস্তাঘাট, মসজিদ-মাদ্রাসা, মন্দির, গীর্জা, প্যাগুডা, স্কুল-কলেজসহ সামাজিক প্রতিষ্টানসমুহ তেমন বেশি যেমন ছিলনা, তেমনি জনসংখ্যার চাহিদা পুরণে অগ্রণী ভুমিকা পালন করতে পারতনা। এখানে গ্রামীন মানুষের মৌলিক অধিকার (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা চিকিতসা)ছিল সুদুর পরাহত। মানুষের চাহিদা ও যোগানের ক্ষেত্রে ছিল যোজন যোজন ফারাক। গ্রামীন জনপদে কৃষক-কৃষানী বিভিন্ন প্রজাতের ফসল ফলাত, কিন্তু উপযুক্ত মুল্য পেতনা। গ্রামীন জনপদের মানুষগুলো ‘দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্রে’ আবদ্ধ ছিল জনম জনম। দেশ সেবার ব্রত হিসেবে তাদেরকে যারা শাসন করত, তারা সাধারন মানুষকে সেই বিখ্যাত ‘দাস প্রথার’ দাসের মত ব্যবহার করত। গ্রাম্য মেম্বার, চেয়ারম্যান, মোড়ল, মাতব্বরগুলোর আবাসন বা অফিস ছিল এক একটি বিচারালয়। তাদের মুখের কথা, আদেশ, নির্দেশ, নিষেধ ছিল আইন, অনেকাংশে রাষ্ট্রীয় আইনেরও উর্ধ্বে। যেমন ইচ্ছে সাধারন মানুষদের তারা শাসনের নামে শোষন করেছে। অনেকাংশে করেছে নিপীড়ন, নির্যাতন। এটাই ছিল তখন রেওয়াজ বা রীতি! সাধারণ মানুষের বিচারের বাণী নীরবে নির্ভৃতে কেঁদে ফিরেছে ! অবশ্য অনেক ভাল ভাল শাসকও বিদ্যমান ছিল, যারা সত্যিকারের জনসেবা করেছেন। (কথিত আছে কোন কোন মোড়ল, বিচারক বিবদমান দু পক্ষের বিচার মিটিয়ে দেবার জন্য কোন পক্ষ থেকে তাদের বাড়িতে প্রদত্ত পানি বা পান পর্যন্ত গ্রহণ করতেন না)।
কিন্তু বর্তমানে আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা ঠিক বিপরীত। সমাজের বাস্তবতা ভিন্ন। সমাজে এখন অবস্থাপন্ন মানুষের অভাব নেই। বৈধ বা অবৈধভাবে মানুষ টাকার পাহাড় গড়েছে। এখন প্রত্যেকে প্রত্যেককে ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স, সহায় সম্পত্তি, দালান-কৌটা দিয়ে বা টাকার স্কেলে মাপার চেষ্টা করে। সমাজে কে কত টাকার মালিক, কত ক্ষমতার মালিক, কত পেশি শক্তির অধিকারী সেটা নিয়ে চিন্তা করে, ভাবে, সমঝে চলে। এখন সমাজে ঠিক ‘আমরা সবাই রাজা’ টাইপের অবস্থা বিদ্যমান। কেহ কারও কথা শুনেনা, কেহ কাউকে সমীহও করেনা। মুখে এক ভাষা, কিন্তু অন্তরের ভিন্ন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল গুলো, অংগসংগঠনসমুহ এক বৃন্তের বহু ফুল না হয়ে রীতিমত বহুধা বিভক্ত হয়ে পড়েছে। রাজনীতিবিদরা লোভী, পরশ্রীকাতর, নিজেদের মধ্যে ইজম সৃষ্টি করে জাতীয় নেতা, জেলা নেতা, উপজেলা নেতা, ইউনিয়ন নেতা, পাতিনেতা, উপনেতা, তৃনমূল নেতাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সমাহার। আবার তারাই বিভিন্ন নির্দিষ্ট বলয় সৃষ্টি করে রেখেছে অতিযত্নে। স্থানীয় নেতা, নেতৃ সবাই পরিচিত মুখ, কেহ কারও আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পরিচিতমুখ বা কারও আপনজন। যে কারও প্রয়োজনে সাধারন মানুষ নেতাদের সান্ন্যিধ্য পেতে চায় বা গাইড লাইন নিতে চায়। কিন্তু বিধিবাম ! এখানে আবার নেতারা বিভিন্ন বলয়ে আবদ্ধ থাকে, সাথে সাধারণ মানুষকেও বিভিন্নভাবে ব্রাকেট বন্দী করে রাখা হয়েছে ! সমাজের যেকেহ, কারও প্রয়োজনে বিভিন্ন নেতার সান্নিধ্য কামনা করতেই পারে, এটাই স্বাভাবিক কিন্তু বিভিন্ন বলয় সৃষ্টি করে রাখার জন্য একবলয়ের মানুষ অন্যবলয়ে দিবালোকে/চোখে পড়ার মত যাতায়াত করতে পারেনা। বিভিন্ন বলয়ের নেতারা সাধারন মানুষকে একপ্রকার জিম্মী করে ফেলেছে। আবার নেতাদের চেয়ে পাতি টাইপের নেতারা বেশি মারাত্মক, ‘যেন আগুনের চেয়ে পাত্র/ঢাকনাই বেশি গরম’ অবস্থা!
ইয়াং জেনারেশন, এখন মরণ নেশা ইয়াবার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে। অনেকেই নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়েই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সেই কারবারের সাথে সম্পর্ক ছেদ করতে পারছেনা। আবার অনেকেই অতিলোভের বশবর্তী হয়ে ইয়াবা কারবারীর চোরাবালিতে আটকে যাচ্ছে মনের অজান্তে। এখন অনেকেই ইয়াবার টাকা হালাল করার জন্য বিভিন্ন ছদ্মবেশে আছে, কেহ কনস্ট্রাকশনের সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে, কেহ সু উচ্চ অট্রালিকা তৈরি করে নামে মাত্র ব্যাংক লোন নিয়ে, অবৈধ আয়ের উৎস হালাল করার সংগ্রামে লিপ্ত বা আবার অনেকেই দেশের বাইরে বিভিন্নভাবে টাকা পাচার করে বিদেশ চলে যাবার ধান্ধায় আছে। আবার অন্য কেহ সরকার দলীয় বিভিন্ন পর্যায়ের পদবী টাকার বিনিময়ে বা বিভিন্ন কৌশলে হাতিয়ে নিয়ে রীতিমত বড় বড় ‘আওয়ামীলীগার’ হয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে !

আমাদের উখিয়া একটি জনবহুল রোহিঙ্গা অধ্যুষিত জনপদ হবার কারনে, এখানে সরকারী বিভিন্ন পর্যায়ের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মাঠে রয়েছে। নিশ্চয়ই তাদের কাছে উপরোক্ত কথাগুলোর সত্যতা পরিলক্ষিত হবার মত তথ্য, উপাত্ত, পরিসংখ্যান আছে বা সমাজে কারা কারা ইয়াবা বাণিজ্য, দূর্নীতি,অনিয়ম, দুঃশাসনের ‘খড়গ হস্ত’ তাদের একাধিক লিষ্ট রয়েছে। কিন্তু কোন অদৃশ্য ইশারায় বা কোন কৌশলগত কারনে তারা তেমন তৎপর হচ্ছেন না বা তৎপরতা দেখাচ্ছেন না তা আল্লাহই ভাল জানেন। অবশ্য কালেভদ্রে তাদের কিছু কিছু অভিযানের খবরাখবর পত্রপত্রিকায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখে পড়ে যা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্ত স্বল্প।
কক্সবাজারের দক্ষিণাংশের সীমান্তবর্তী এলাকা উখিয়া। এতদঅঞ্চলের একদিকে বিশাল বনায়ন, অন্যদিকে দিগন্ত ছোয়া উঁচু উঁচু পাহাড়, পর্বত, মালভুমি, সমুদ্র ও সমতলভুমি যার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অপূর্ব প্রকৃতির সৌন্দর্য্যের সমারোহ। কোথাও কোথাও প্রবাহিত হয়েছে প্রাকৃতিক ঝর্ণাধারা। অপরুপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি কক্সবাজারের দক্ষিণাংশ প্রকৃতির উপর নিষ্টুর অত্যাচারে আজ দিশেহারা যেন মনুষ্যজাতি পাহাড় ও বনভুমি ধ্বংসের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। পার্শ্ববর্তী মিয়ানমারের বিভিন্ন অংগরাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা প্রতিদিন উজাড় করছে বনভূমি; ধ্বংস করছে পাহাড়, গাছপালা ও লতাগুল্ম। সাথে রয়েছে তাদের সেবা প্রদানের জন্য নিয়োজিত দেশি বিদেশি এনজিও, আইএনজিও কর্মীদের আবাসস্থল, বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী, লজিস্টিক সামগ্রী রাখার ও পরিবেশনের জন্য নির্মিত গুদাম ঘর ও অন্যান্য প্রয়োজনে নির্মিত হচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন উন্নয়নমুলক কর্মসূচী। এসব প্রত্যেকটি কার্যক্রমে ক্রমাগত চাপ রয়েছে পাহাড়, বনভুমি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের উপর। ফলে হুমকির মুখে রয়েছে এতদঅঞ্চলের পরিবেশ, প্রতিবেশ, ইকোসিস্টেম, বাস্তুসংস্থান ও জীববৈচিত্র্য। মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে ইনানী এলাকায় সরকার অনুমোদিত এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোনসহ বিভিন্ন পাহাড়, টিলা, উপত্যকা ও বাংলাদেশের দক্ষিনাঞ্চলের সংরক্ষিত বনাঞ্চলসমুহ।
বর্তমান বিশ্বে পরিবেশগত সমাস্যা একটি মারাত্মক সমাস্যা। নিজেদের অবহেলার কারনেই প্রতিদিন আমরা চারপাশে তৈরি করছি বিষাক্ত পরিমন্ডল, নিজেদের ও ভবিষ্যত প্রজন্মকে ঠেলে দিচ্ছি এক নিঃশব্দ বিষক্রিয়ার মধ্যে। ফলে ঘটছে পরিবেশের মারাত্মক অবনতি, যা আমাদের জীবন, জীবিকা ও বেঁচে থাকার জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরুপ। একসময় বাংলাদেশ ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভুমি। এ দেশের মাঠ, ঘাট, পাহাড়, পর্বত, নদী-নালা, বায়ু সবকিছু ছিল নির্মল ও বিশুদ্ধ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, মনুষ্য বাসের বা প্রাণিকুলের বেঁচে থাকার পরিবেশের প্রধানতঃ তিনটি উপাদান মাটি, পানি ও বায়ু নানা উপায়ে দূষিত হচ্ছে। এ দূষন আমরা ঘটাচ্ছি কখনো জেনে বা কখনও অবচেতন মনে।
তাছাড়া জলবায়ু ও পরিবেশ দূষণের ক্ষেত্রে মানুষের সংশ্লিস্টতা কতটা দায়ী তার উত্তর খুঁজতে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা রীতিমতো গোয়েন্দাগিরি গবেষণা চালিয়ে অবশেষে মন্তব্য করেছেন—বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু ও পরিবেশ বিনষ্টে প্রধানত নেতৃত্ব দিচ্ছে অনিঃশেষ জনসংখ্যার অনাকাঙ্ক্ষিত বিস্ফোরণ। এ ফলাফল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এক শ ৫০ বছর ধরে পরিবর্তিত পারিপার্শ্বিকতার বিভিন্ন দিকগুলো পৃথক পৃথকভাবে বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে। সে সব বিশ্লেষণে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, মানবসৃষ্ট কার্যকারণে উত্তপ্ত সূর্যরশ্মি (বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর ক্ষয়ে যাওয়ার কারণে) ও গ্রিনহাউস গ্যাস ভূপৃষ্ঠের প্রত্যেক স্থানে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করে কীভাবে ডেকে আনছে বিশ্ব পরিবেশের বিপর্যয়। বিস্তীর্ণ সাগর-মহাসাগরের জলে সেই প্রতিক্রিয়া কেমনভাবে ঘনিয়ে তুলেছে বিপদসংকুলতার নানান স্তর। পৃথিবীব্যাপী বনাঞ্চলের ধ্বংস প্রাপ্তির পর্যায়ক্রম ক্ষতির কোন কোন পর্যায়গুলোকে করে তুলেছে দৃশ্যমান। ব্যবহৃত অথবা অব্যবহৃত বর্জ্যের ক্রমপ্রসারমানতা কেমন করে দূষিত করছে বিরাট বিশ্বের মুক্ত বায়ু। প্রাকৃতিক সম্পদের অতি ব্যবহার কতটা নির্দয়ভাবে বয়ে আনছে ভবিষ্যৎ পরিবেশের করুণ পরিণতি। এদের প্রত্যেকটি নেগেটিভসূচক কার্যকারণের সম্পৃক্ততায় জড়িত থাকার কারণে জীব ধাত্রী পৃথিবীর বায়োডাইভারসিটি কী মারাত্মক বাস্তবতার সম্মুখীন আছে!

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা হুমকি-বিশেষ করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তার ওপর যেসব ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে বিশ্বের প্রায় সব দেশই এখন একমত। বাংলাদেশও এখানে ব্যতিক্রম নয়। প্রকৃতপক্ষে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির সম্মুখীন, বাংলাদেশ সেগুলোর মধ্যেএকটি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি জলবায়ু থেকে উদ্ভব হলেও এটি মনুষ্যসৃষ্ট। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, প্রাকৃতিক সম্পদের চাহিদা বৃদ্ধি, বনাঞ্চল ধবংশ, ওজোন স্তরের ক্ষয়, অতিরিক্ত মাত্রায় কার্বন নিঃসরন, উন্নত দেশসমুহের শিল্পায়ন থেকে মাত্রাতিরিক্ত গ্যাস, কার্বন, কার্বন মনো-অক্সাইড নিঃসরন ও ব্যাপকহারে নগরায়নের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাকে বিপজ্জনক মাত্রায় বৃদ্ধি করেছে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সারা বিশ্বের অর্থনীতির ওপর প্রতিকূল প্রভাব পড়বে। উপকূলীয় অবকাঠামো—সমুদ্রবন্দর, রাস্তাঘাট ও রেলসংযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বন্দরসমূহের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যাহত হবে। এর ফলে সমুদ্রোপকূলবর্তী শহর ও রাষ্ট্রসমূহের মানুষকে সেবা দেওয়ার সক্ষমতা হ্রাস পাবে, যা রাষ্ট্রসমূহকে ভঙ্গুর করে তুলবে।

জীববৈচিত্র্যের ওপর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব হবে ধ্বংসাত্মক। লবণাক্ত পানির সংক্রমণের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের মাটির গুণগত মানের পরিবর্তন হবে, যা ওই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য, বিশেষত গাছপালার ওপর প্রতিকূল প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশের সুন্দরবনের ওপর বর্তমানে যে প্রতিকূল প্রভাব আমরা দেখছি, তা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। অনেক সামুদ্রিক জীব অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন হবে। কারণ, পানির উচ্চতার পরিবর্তনের ফলে এরা আলো ও অক্সিজেনের স্বল্পতায় ভুগবে। এককথায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতায় পরিবর্তনের ফলে সমগ্র পৃথিবীর জীব বৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে যাবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে যেসব সমস্যার সৃষ্টি হবে, তা ‘ঝুঁকি গুণিতক’ (Threat Multiplier)-এর কাজ করবে। ফলে যেসব সমস্যা ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশে বিদ্যমান আছে, সেগুলো আরও প্রকট হয়ে দেখা দেবে, যা চূড়ান্তভাবে তাদের সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে। যেসব দেশের শাসনব্যবস্থা দুর্বল, এসবসমস্যাতাদেরআরওভঙ্গুরকরেতুলবে।

এ জনপদের সাধারন মানুষ খুবই কষ্টে আছেন, কেহ কারও মনের দুঃখ, আকুতি কোন নেতাকে বা জনপ্রতিনিধিকে মন খুলে বোঝাতে সক্ষম হচ্ছেন না। নেতারা/জনপ্রতিনিধিরা অনেক ক্যালকুলেশনে চলেন। তারা জনসেবার চেয়ে, নিজের আধিপত্য ধরে রাখা বা বিভিন্নভাবে অর্থালোভী হয়ে পড়েছে। এখানে কিছু কিছু অনিয়ম রীতিমত নিয়মে পরিনত হয়েছে। আবার যারাই অনিয়ম দুরীকরণ করার কথা তারাই রীতিমত অনিয়মগুলো জিইয়ে রেখে স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেন। অনেকেই দূর্নীতি, চোরাকারবারী ও ইয়াবা কারবারের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত হয়ে পড়েছে। পত্রিকায় চোখে পড়ল, উখিয়ার একটি ইউনিয়নের প্রত্যেকটা সদস্য/জনপ্রতিনিধি ইয়াবা কারবারের সাথে জড়িত! ভাবতেই অবাক লাগে। চিন্তা করি এসকল জনপ্রতিনিধিদের দিয়ে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মাদক ও দূর্নীতির বিরুদ্ধে ঘোষিত জিরো টলারেন্স নীতি কিভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব? আবার মাঝে মাঝে তনু মনে প্রশ্নের উদ্রেক হয়, গ্রামীন নেতারা/জনপ্রতিনিধিরা এত ছোট মনের হয় ক্যামনে? এত ছোট মন নিয়ে তো দেশের বৃহত্তর স্বার্থে বড় কাজে সেসব নেতারা আত্মনিয়োগ করতে পারবেন না। যাদের মন-মানসিকতা নিচ, হীন বা সন্দেহপ্রবণ বা পরশ্রীকাতর, তারা কিভাবে দেশের বৃহত্তর প্রয়োজনে বড় কাজের আঞ্জাম দেবেন তা ভাবতেও অবাক লাগে!
বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার যুগ। বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ। বর্তমান বিশ্বকে বলা হয় “গ্লোবাল ভিলেজ”। আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে নিমিষেই পৃথিবীর যেকোন প্রান্তের চলমান ঘটনাপুঞ্জ সারা পৃথিবী ব্যাপী সেকেন্ডেই ব্যাপকতা লাভ করছে অতি সহজে। আমাদের উখিয়ার জনপদও আধুনিকতার ছোঁয়া থেকে কোন অংশে কম নয়। বর্তমানে অত্র মানবতার জনপদ নামে অধিক পরিচিত। স্থানীয় তিন লক্ষাধিক জনসংখ্যার উপর রীতিমত চাপ সৃষ্টি করছে পার্শ্ববর্তী দেশের প্রায় ১৪ লক্ষাধিক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্টী। জনসংখ্যার ভারে বলতে গেলে ন্যুব্জ এই জনপদ। দেশি-বিদেশী এনজিওগুলো এতদঅঞ্চলে মানবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে অব্যাহতভাবে।

লেখক: সভাপতি- বাপা ( বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন) ও মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান এইড ইন্টারন্যাশনাল, উখিয়া উপজেলা শাখা

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।